ইব্রাহিম খলিল বাদল
বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যে নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, সেটি কেবল একটি আসনভিত্তিক সমঝোতা নয়—বরং একটি সুস্পষ্ট আদর্শিক ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে আট ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও এলডিপির যুক্ত হওয়া রাজনীতির মাঠে একটি সংগঠিত ব্লকের জন্ম দিয়েছে, যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সুসংহত ও লক্ষ্যভিত্তিক।
জোটের নেতৃত্ব: জামায়াত কেন কেন্দ্রবিন্দুতে
এই জোটের কেন্দ্রে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান কাকতালীয় নয়। সাংগঠনিক শক্তি, মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘ আন্দোলনের অভিজ্ঞতার কারণে জামায়াত কার্যত এই ব্লকের অপারেশনাল কোর। অন্য দলগুলো—খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বা নেজামে ইসলাম—আদর্শিকভাবে কাছাকাছি হলেও জাতীয় পর্যায়ে আসন ব্যবস্থাপনা ও নির্বাচনি কৌশলে জামায়াতের ওপরই নির্ভরশীল।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জামায়াত এবার নিজেদের একক শক্তি নয়, বরং ‘সমষ্টিগত শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করছে—যা অতীতে তাদের রাজনীতিতে তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
এনসিপির প্রবেশ: আদর্শ না কৌশল?
এনসিপির জোটে যোগ দেওয়াই এই সমঝোতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। এনসিপি নিজেকে ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে নয়, বরং নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রসংস্কার ও সার্বভৌমত্বের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সেই দলটির জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়া অনেকের কাছেই প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে এনসিপির ব্যাখ্যা পরিষ্কার—এটি আদর্শিক সমর্পণ নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের কৌশল। ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী শক্তি’ ও ‘গণভোটে হ্যাঁ’—এই দুই রাজনৈতিক বয়ান এনসিপিকে জোটের ভেতরে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রাখার সুযোগ দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি বুঝতে পেরেছে—এককভাবে নির্বাচনে টিকে থাকা কঠিন। জোটে ঢুকে তারা মাঠ, প্রতীক ও সাংগঠনিক নিরাপত্তা পাচ্ছে; বিনিময়ে জামায়াত পাচ্ছে শহুরে, তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটব্যাংকে প্রবেশাধিকার।
এলডিপি: পুরোনো রাজনীতির পুনঃপ্রবেশ
কর্নেল (অব.) অলি আহমদের এলডিপি এই জোটে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এলডিপি আদর্শিকভাবে ইসলামী দল না হলেও তাদের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ও সার্বভৌমত্বের রাজনীতি এই জোটের সঙ্গে একটি ন্যূনতম অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।
এলডিপির যুক্ত হওয়া জোটটিকে কেবল ধর্মভিত্তিক বলয় থেকে আংশিকভাবে বের করে এনে একটি বিস্তৃত সরকারবিরোধী ফ্রন্ট হিসেবে উপস্থাপন করছে।
আসন সমঝোতা: ঐক্যের শক্তি না ভবিষ্যৎ দ্বন্দ্ব?
৩০০ আসনে প্রায় পূর্ণ সমঝোতার ঘোষণা যতটা আশাব্যঞ্জক, বাস্তবতায় তা ততটাই সংবেদনশীল। শেষ মুহূর্তে যুক্ত হওয়া এনসিপি ও এলডিপিকে জায়গা দিতে গিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দ্বন্দ্ব, বিদ্রোহী প্রার্থী কিংবা নীরব অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষ করে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো শক্ত সংগঠনের এলাকায় নতুন দলকে আসন ছাড় দেওয়া কতটা মসৃণ হবে—তা মনোনয়নপত্র দাখিলের পরই স্পষ্ট হবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’: নির্বাচনের বাইরের রাজনীতি
এই জোটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গণভোটে একযোগে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা কেবল সংসদ নির্বাচন নয়—রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েও একটি অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে আনতে চাচ্ছে।
এখানে জোটটি নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, পরবর্তী আন্দোলন বা চাপ সৃষ্টির রাজনীতির জন্য একটি ভিত্তি গড়ে রাখছে।
সমতল মাঠের প্রশ্ন ও বাস্তবতা
ডা. শফিকুর রহমানের ‘সমতল মাঠ নেই’ মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একদিকে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ওপর চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার একটি প্রাক-প্রস্তুত ভাষ্যও তৈরি করছে।
জামায়াতের নেতৃত্বে এই ১০ দলীয় জোট বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। এটি ক্ষমতায় যাওয়ার নিশ্চয়তা না দিলেও সরকারবিরোধী রাজনীতিকে একটি সংগঠিত রূপ দিয়েছে। এনসিপির যুক্ত হওয়া জোটটিকে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করেছে, আবার আদর্শিক প্রশ্নও সামনে এনেছে।
এই জোট সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—
১) আসন সমঝোতা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়,
২) তারা কতটা ভোটার আস্থা অর্জন করতে পারে, এবং
৩) নির্বাচন বাস্তবেই কতটা অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হয়।
নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর আগের মতো একমুখী নয়—এই জোট সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
ইব্রাহিম খলিল বাদল
সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পাটি-বিএইচপি।



