বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬

জন্মভূমিকে অস্বীকারের মূল্য: ভারতীয় মুসলমান কেন নিজের ইতিহাসের শত্রু হয়ে উঠল?

পাঠক প্রিয়

সুফি সাগর সামস্

ইতিহাস কখনো নির্দোষ নয়। কিন্তু ইতিহাসকে অস্বীকার করা আত্মঘাতী। উনিশ শতকে যখন ভারতবর্ষ নিজের অতীতকে নতুন করে চিনল, তখনই শুরু হলো এক ভয়ংকর বিভাজন—যার দায় শুধু ঔপনিবেশিক শক্তির ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া হবে। এই বিভাজনের বড় দায় আছে ভারতীয় মুসলিম সমাজের চিন্তাগত নেতৃত্বের ওপর।

ভারতবর্ষের ইতিহাস যখন বুদ্ধ, অশোক, সমুদ্রগুপ্ত, গঙ্গা-যমুনা, অজন্তা-ইলোরার আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছিল, তখন মুসলিম সমাজের একাংশ সেই আলোকে চোখ বুজে প্রত্যাখ্যান করল। যুক্তি একটাই—“এগুলো হিন্দুদের ইতিহাস, আমাদের নয়।” এই এক বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে শতাব্দীর সাংস্কৃতিক আত্মবিনাশ।

ধর্ম বনাম দেশ: মিথ্যা দ্বন্দ্বের জন্ম

ভারতীয় মুসলমানদের বোঝানো হলো—ভারতীয় ঐতিহ্য মানেই ইসলামবিরোধিতা। দেশপ্রেম মানেই ঈমানহানি। ফলে ধর্ম আর দেশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো, যেন দুটো একসাথে থাকা অসম্ভব। প্রশ্ন হলো—এই তত্ত্ব এল কোথা থেকে? কোরআন থেকে? না ইতিহাসবোধহীন আলেমি সংকীর্ণতা থেকে?

যে গঙ্গা-যমুনার পাড়ে মুসলমান জন্মেছে, বড় হয়েছে, কবর হবে—সেই নদীকে ‘বিজাতীয়’ বানানো হলো। যে মাটির ফসল খেয়ে মুসলমান বেঁচে আছে, সেই মাটির ইতিহাসকে বলা হলো ‘ওদের’। এর চেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনা আর কী হতে পারে?

ওয়াহাবি মানসিকতা: শিকড় ছেঁড়ার ফতোয়া

এই আত্মবিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে কার্যকর কারিগর ছিল কট্টরপন্থী আলেমি বয়ান। আরবের মরুভূমিকে বানানো হলো পবিত্র স্মৃতি, আর ভারতের নদী-অরণ্যকে করা হলো সন্দেহজনক। মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্য ‘ইসলামি’, আর ভারতীয় সাহিত্য ‘হিন্দুয়ানি’। এই বিভাজন ধর্মীয় নয়—এটি ছিল রাজনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক।

ফলাফল?
ভারতীয় মুসলমান নিজের চোখে নিজের সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতে শিখল। শিউলী ফুল হয়ে উঠল অপরাধবোধের কারণ। অজন্তা-ইলোরা হয়ে উঠল হুমকি। ইতিহাসকে ভালোবাসা যেন ঈমান নষ্ট করার নামান্তর।

বিকৃত নায়কচর্চা: ক্ষমতাই যখন একমাত্র মানদণ্ড

আরও ভয়ংকর হলো ইতিহাস বাছাইয়ের নীতি। অশোক—যিনি সহিংসতা ত্যাগ করে মানবিক শাসনের উদাহরণ রেখে গেছেন—তিনি ‘আমাদের নন’। কিন্তু গজনীর মাহমুদ—যার অভিযান ছিল লুণ্ঠননির্ভর—তিনি ‘আমাদের ঐতিহ্য’। কেন? কারণ তিনি মুসলমান শাসক।

এই মানসিকতায় ইতিহাসের নৈতিকতা নয়, ধর্মীয় লেবেলই শেষ কথা। শাসক যদি মুসলমান হন, তবে তার রাজনীতি প্রশ্নাতীত। এই যুক্তি শুধু অসত্ নয়—এটি আত্মঘাতী।

জন্মভূমিতে মানসিক নির্বাসন

এই সবকিছুর চূড়ান্ত ফল হলো—ভারতীয় মুসলমান নিজ দেশেই মানসিকভাবে নির্বাসিত। তিনি ভারতকে ভালোবাসতে দ্বিধা করেন, আবার আরব-তুরস্ক কখনোই তার দেশ হয়ে ওঠে না। তিনি দুই জগতের মাঝখানে ঝুলে থাকেন—না এখানে পুরোপুরি আপন, না সেখানে সত্যিকার উত্তরাধিকারী।

এই শূন্যতাই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সবচেয়ে উর্বর জমি। এখান থেকেই জন্ম নেয় অবিশ্বাস, ভয় এবং সহিংসতার মানসিক প্রস্তুতি।

শেষ কথা: ইতিহাস ফিরিয়ে না আনলে ভবিষ্যৎও ফিরবে না

যে সমাজ নিজের মাটি, প্রকৃতি ও ইতিহাসকে অস্বীকার করে, সে সমাজ কখনো নিরাপদ হতে পারে না—না রাজনৈতিকভাবে, না নৈতিকভাবে। ভারতীয় মুসলমান যদি ভারতীয় ইতিহাসকে নিজের ইতিহাস হিসেবে পুনরুদ্ধার না করে, তাহলে সে চিরকাল অন্যের লেখা পরিচয়ের বোঝা বইবে।

প্রশ্নটা তাই ধর্মের নয়।
প্রশ্নটা সাহসের—
নিজের জন্মভূমিকে নিজের বলে মেনে নেওয়ার সাহস।

সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।

সর্বশেষ সংবাদ

‘সার্ভিস’ শব্দের বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু কী মানুষের মুক্তি ঘটেছে?

সুফি সাগর সামস্ ভাষা, ক্ষমতা ও মানবমর্যাদা নিয়ে একটি পুনর্বিবেচনা সভ্যতার ইতিহাসে শব্দ কখনো কেবল শব্দ নয়; তারা একটি যুগের সামাজিক...

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ, জরুরি সংবাদ সম্মেলন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, শুক্রবার: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন জাতীয় সংসদের...

মানবমস্তিষ্ক: মহাবিশ্বের ভেতর আরেক মহাবিশ্ব

সুফি সাগর সামস্ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি কি কোনো নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা কৃষ্ণগহ্বর? হয়তো নয়। হয়তো সবচেয়ে বিস্ময়কর কাঠামো হলো মানবমস্তিষ্ক—কারণ এই ক্ষুদ্র জৈবিক অঙ্গই সমগ্র মহাবিশ্বকে...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে গেলে স্বাধীনতার মূল্যবোধও হারাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা না গেলে একসময় স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধও হারিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ...

এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না : ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশৃঙ্খল করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে...

জনপ্রিয় সংবাদ