বিশেষ প্রতিবেদক

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি, দ্রুত চাহিদা বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভর নীতির ফলে খাতটি ক্রমেই ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০১৮ সালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু হয় জরুরি সমাধান হিসেবে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেটি রূপ নিয়েছে উচ্চমূল্যের স্থায়ী নির্ভরতায়।
২০১৮ সালে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। পরের বছর থেকে স্পট মার্কেট ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আমদানি বাড়ানো হয়। বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালী এলাকায় ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে।
একটি টার্মিনাল পরিচালনা করছে মার্কিন কোম্পানি Excelerate Energy এবং অন্যটি সামিট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান Summit LNG Terminal Company Limited।
বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ৩,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতার মধ্যে প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট আসে এলএনজি থেকে। পরিমাণে কম হলেও ব্যয়ের চাপ অত্যন্ত বেশি।
ব্যয়ের চিত্র: অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী—
-
বছরে গড়ে ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানি হয়
-
প্রতিটির গড় মূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা
-
২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত মোট ব্যয় প্রায় ২,০৫,২৫৪ কোটি টাকা
-
একই সময়ে ভর্তুকি ৩৬,৭৬৫ কোটি টাকার বেশি
এলএনজি আমদানির চাপ সামাল দিতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধাক্কা লাগে ২০২২ সালে। চলতি অর্থবছরে আমদানি বিল পরিশোধে বিশ্বব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে।
সরকারি হিসাবে—
-
২০০৯ সালের তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৩৩০%
-
গ্যাসের দাম বেড়েছে ৪০০%
-
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক লোকসান বেড়েছে ১,৩০০%
দেশীয় গ্যাস বনাম এলএনজি: ১৮ গুণ ব্যবধান
দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটারে খরচ প্রায় ৩ টাকা (পূর্বে ১ টাকা)।
অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজির খরচ প্রায় ৫৫ টাকা।
অর্থাৎ এলএনজি প্রায় ১৮ গুণ বেশি ব্যয়বহুল। উচ্চমূল্যে আমদানি করে কমদামে সরবরাহ করায় ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। উপরন্তু এলএনজি চুক্তি ডলারভিত্তিক হওয়ায়—
-
ডলার সংকট বাড়ছে
-
রিজার্ভ কমছে
-
টাকার অবমূল্যায়ন হচ্ছে
-
আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে
এই চক্র সামষ্টিক অর্থনীতিকে দুর্বল করছে।
পেট্রোবাংলা ও পিডিবির আর্থিক সংকট
এলএনজি আমদানি শুরুর আগে Petrobangla-র নিজস্ব এফডিআর ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। চার বছরের মধ্যে তা শেষ হয়ে যায়। এখন সংস্থাটি ঋণনির্ভর।
অন্যদিকে Bangladesh Power Development Board (পিডিবি)-র বকেয়া ৪০–৫০ হাজার কোটি টাকার ঘরে। ক্যাপাসিটি চার্জ ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণে ঘাটতি বাড়ছে।
বিনিয়োগের অসামঞ্জস্য
গত সাত বছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২.০৫ ট্রিলিয়ন টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে সম্ভাব্য ব্যয় ৫৮ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে—
-
স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননে বরাদ্দ মাত্র ১,১২৯ কোটি টাকা
-
অর্থাৎ আমদানিতে ব্যয় স্থানীয় অনুসন্ধান বাজেটের ৫১ গুণ
বিদ্যুৎ খাতে বছরে ২০ হাজার কোটির বেশি বরাদ্দ থাকলেও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ দেড় হাজার কোটির নিচে। অথচ জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা: এখনো অপূর্ণ
বাংলাদেশে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন মাত্র ৩%।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পাঞ্চলে সোলার–উইন্ড হাইব্রিড প্রকল্প, উপকূলীয় বায়ু বিদ্যুৎ—এসব খাতে কাঠামোগত প্রণোদনা ও সহজ অর্থায়ন এখনো সীমিত।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বনাম নীতিগত বাস্তবতা
বিএনপি তাদের ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও সাম্প্রতিক ১০০ দিনের পরিকল্পনায় এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কক্সবাজারে আরও টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
প্রশ্ন উঠছে—দেশ কি ব্যয়বহুল আমদানি নির্ভরতার এক চক্রে আটকে যাচ্ছে?
বিকল্প পথ: নীতি পুনর্বিন্যাসের সময় কি এখন?
১. দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার
-
অনশোর ও অফশোর ব্লকে দ্রুত জরিপ
-
আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বে গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান
-
অনুসন্ধান বাজেট বহুগুণ বৃদ্ধি
একটি মাঝারি আকারের গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারই বছরে হাজার কোটি টাকার আমদানি কমাতে পারে।
২. নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর
-
বাধ্যতামূলক ছাদভিত্তিক সৌর ব্যবস্থা
-
শিল্পাঞ্চলে নেট-মিটারিং সম্প্রসারণ
-
বায়ু বিদ্যুৎ সম্ভাবনা কাজে লাগানো
-
জীবাশ্ম জ্বালানিতে প্রণোদনা কমিয়ে সবুজ জ্বালানিতে স্থানান্তর
৩. ভর্তুকি সংস্কার ও দক্ষতা বৃদ্ধি
-
টার্গেটেড ভর্তুকি
-
এলএনজি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন
-
সিস্টেম লস ও অপচয় কমানো
এলএনজি আমদানি স্বল্পমেয়াদে প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়—বিশেষ করে যখন দেশীয় অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ সীমিত।
জ্বালানি নিরাপত্তা মানে কেবল সরবরাহ নিশ্চিত করা নয়; বরং অর্থনৈতিকভাবে সহনীয়, স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কাঠামো গড়ে তোলা।
বাংলাদেশ কি সেই কৌশলগত পুনর্বিবেচনার পথে হাঁটবে, নাকি আমদানি নির্ভরতার ব্যয়বহুল চক্রেই আবদ্ধ থাকবে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।







