জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ভুল করা হয়েছে। সেই ভুলের নাম—বাহাত্তরের সংবিধানের অধীনে তথাকথিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন। বিপ্লবী সরকার কিংবা সর্বদলীয় জাতীয় সরকার গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা হয়েছে। আজ রাষ্ট্র সেই ভুলের মূল্য রক্ত দিয়ে দিচ্ছে।

যারা এই অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছে, তারা এখন আতঙ্কগ্রস্ত। এই আতঙ্ক কোনো কল্পনার ফল নয়—এটি জনগণের ক্রমাগত মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিক্রিয়া। জুলাই অভ্যুত্থানে যে জনসমর্থন তারা পেয়েছিল, তা অভ্যুত্থান-পরবর্তী আর্থিক লুটপাট, ক্ষমতার দম্ভ এবং প্রকাশ্য মব সন্ত্রাসে নিমজ্জিত হয়ে আজ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাদের জন্য একটি রাজনৈতিক মৃত্যুদণ্ডের মতো। তারা জানে—এই নির্বাচন হলে জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের পর জন্ম নেওয়া ক্ষমতালোভী গোষ্ঠীর হিসাব চুকিয়ে দেবে। ঠিক যেভাবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা গণরোষের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই এই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সুবিধাভোগীদের রাজনৈতিকভাবে পালাতে হবে।
এই ভয় থেকেই নির্বাচন ঠেকানোর সর্বাত্মক চক্রান্ত চলছে। তফসিল ঘোষণার আগে নানা অজুহাত, নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা তৈরি—সবই একই ষড়যন্ত্রের অংশ। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে সেই ষড়যন্ত্রে আপাতত ছেদ টেনেছে। একই সময়ে ১৭ বছর নির্বাসন শেষে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিয়েছে—এটাই তাদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।
এখন প্রশ্ন—কারা নির্বাচন চায় না? স্পষ্টভাবে বলতে হবে—জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট ও তাদের আদর্শিক সহযোগীরা প্রকাশ্যে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা চায় অন্তর্বর্তী সরকার অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকুক। তারা ওয়াজের মঞ্চ থেকে রাষ্ট্রীয় অস্থিরতার জন্য দোয়া করে—এটি ধর্ম নয়, এটি নৈতিক দেউলিয়াপনা।
রাজনীতির ইতিহাস যারা জানে, তারা জানে—এই গোষ্ঠীর কোনো নীতিগত সীমা নেই। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত একসঙ্গে নির্বাচিত সরকার উৎখাত করেছিল, আবার নির্বাচন শেষে জামায়াতের সমর্থনেই আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছিল। সুতরাং এদের মুখে নৈতিকতার বুলি নিছক ভণ্ডামি।
তফসিল ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয়েছে পরিকল্পিত খুন, অগ্নিসংযোগ এবং মব সন্ত্রাস। জুলাই বিপ্লবী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি একটি ঠাণ্ডা মাথার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। অথচ সরকার আজ পর্যন্ত খুনিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। প্রশ্ন একটাই—পারেনি, নাকি ধরতে চায়নি?
এই হত্যাকে কেন্দ্র করে যারা রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও সন্ত্রাস চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে সরকারের রহস্যজনক নীরবতা প্রমাণ করে—রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয়েছে। তাহলে কি অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনী মব সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি? নাকি বিপ্লবী সরকার না গঠনের দায় ঢাকতেই সচেতনভাবে দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?
আজ মব সন্ত্রাসীরা এতটাই বেপরোয়া যে তারা বিদেশি দূতাবাসে হামলার হুমকি দিচ্ছে, প্রতিবেশী দেশের রাজ্য বিচ্ছিন্ন করার উস্কানি দিচ্ছে। এগুলো আর রাজনীতি নয়—এগুলো সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহ এবং যুদ্ধ উসকে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—একজন তারেক রহমান বা একটি রাজনৈতিক দল কি একা এই সশস্ত্র, উন্মত্ত মব সন্ত্রাসের মোকাবিলা করতে পারবে? স্পষ্ট করে বলা দরকার—এটি কোনো একক দলের লড়াই নয়। এটি রাষ্ট্র বনাম অরাজকতার লড়াই।
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করছে—এখনই যদি মব সন্ত্রাস দমন না করা হয়, খুনিদের গ্রেপ্তার না করা হয় এবং নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত চূর্ণ না করা হয়, তবে ইতিহাস এই অন্তর্বর্তী সরকারকে ক্ষমা করবে না। গণতন্ত্রকে বন্দি করে কোনো গোষ্ঠী চিরদিন টিকে থাকতে পারেনি—বাংলাদেশেও পারবে না।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


