নিজস্ব প্রতিবেদক

দেড় যুগের নির্বাসনজীবন শেষে দেশে ফিরে বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির সামনে দাঁড়ানো—এই মুহূর্তটি ছিল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য গভীর আবেগের। রাজধানীর জিয়া উদ্যানে শুক্রবার বিকেলে বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে মোনাজাত করেন তিনি। নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার সময় জলভরা চোখ মুছতে দেখা যায় তাঁকে। রাজনীতির দীর্ঘ অনুপস্থিতি, পারিবারিক শোক আর রাষ্ট্রক্ষমতার টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি হয়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের প্রতীক।
শ্রদ্ধা, দোয়া ও নীরবতার ভাষা
লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার পরদিনই বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তারেক রহমান। প্রথমে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা এবং চব্বিশের ছাত্র গণ–অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে মোনাজাত করা হয়। এরপর বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে একান্তে দোয়া করেন তিনি। নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেও আবেগ আড়াল করতে পারেননি বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের এই মুখ।
ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও রাজনৈতিক সংগ্রাম
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় তারেক রহমানের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনেই তাঁকে বহন করতে হয়েছে পারিবারিক শোক ও রাজনৈতিক দমন–পীড়নের ভার। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৫ সালে নির্বাসনে থাকাকালেই ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে হারান তিনি। ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থায় মায়ের পাশাপাশি দুই ভাই গ্রেপ্তার হন। মুক্তির পর তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে ও কোকো মালয়েশিয়ায় চলে যান। সেই নির্বাসন শেষ হলো ছাত্র গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ১৫ মাস পর।
জনসমাগমে শক্তি প্রদর্শন
গতকাল দেশে ফেরার পর পূর্বাচলের জুলাই এক্সপ্রেসওয়েতে লাখ লাখ সমর্থকের সমাগমে সংবর্ধনা নেন তারেক রহমান। বিএনপির নেতাকর্মীদের চোখে এটি ছিল কেবল একজন নেতার প্রত্যাবর্তন নয়, বরং দলীয় রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের সূচনা। সেখান থেকে তিনি যান বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে অসুস্থ মাকে দেখতে। রাতে গুলশানে তাঁর জন্য প্রস্তুত করা বাড়িতে অবস্থান করেন।
আজও গুলশান থেকে বুলেটপ্রুফ বাসে কড়া নিরাপত্তায় জিয়া উদ্যানে আসেন তিনি। পথে পথে নেতা–কর্মীদের ভিড়, হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময়—সব মিলিয়ে রাজধানীজুড়ে ছিল রাজনৈতিক উচ্ছ্বাস।
সামনে ব্যস্ত কর্মসূচি
জিয়া উদ্যান থেকে তারেক রহমান রওনা হন সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশে। আগামীকাল তিনি ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে যাবেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গিয়ে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের কর্মসূচি রয়েছে।
নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির আত্মবিশ্বাস
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে তারেক রহমানের দেশে ফেরা বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। দলটির নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন পর মাঠের রাজনীতিতে তার সরাসরি উপস্থিতি নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় প্রভাব ফেলবে। আবেগ, ইতিহাস আর জনসমর্থনের এই মিলন বিএনপিকে কতটা সাংগঠনিক শক্তি দেবে—সেই উত্তর মিলবে আগামী দিনের রাজনীতিতে।
তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু এক ব্যক্তির দেশে ফেরা নয়; এটি বিএনপির জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যেখানে অতীতের বেদনা আর ভবিষ্যতের রাজনৈতিক লক্ষ্য এক সুতোয় গাঁথা।


