বিশেষ প্রতিবেদক

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে সাফল্যের তুলনায় ব্যর্থতা ও ঘাটতির পাল্লাই ভারী—এমন মূল্যায়ন করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, জুলাই আন্দোলন থেকে দেশের রাজনীতিবিদ ও আমলাতন্ত্র কোনো কার্যকর শিক্ষা গ্রহণ করেনি। ফলে বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন ও সুশাসনের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।
সোমবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
মব সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সহিংসতা: বড় উদ্বেগ
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মব সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত ১৭ মাসে দেশে ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত ও ৭ হাজার ৮২ জন আহত হয়েছেন।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর মাত্র ৩৬ দিনে ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
টিআইবি সতর্ক করে বলেছে, মব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়বে।
সংস্কারের অবকাঠামো আছে, বাস্তবায়ন দুর্বল
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা। কিন্তু দেড় বছরেও সেই ভিত্তি ‘নাজুক’ অবস্থায় রয়ে গেছে।
তিনি বলেন,
“সংস্কারকে কেবল ‘সংস্কার’ হিসেবেই দেখা হয়েছে। বাস্তবায়নের ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও নিরসনের কোনো সুসংগঠিত উদ্যোগ দেখা যায়নি।”
বিচার, নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে অবকাঠামো তৈরি হলেও তা পর্যাপ্ত শক্তিশালী ও কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করা হয়।
নির্বাচনী পরিবেশ: অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাঝুঁকি
গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—
-
নির্বাচনী সহিংসতা, প্রার্থীদের ওপর হামলা ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বেড়েছে
-
১,৩৩৩টি অস্ত্র নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে
-
ডিপফেক ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি গুরুতর আকার ধারণ করেছে
-
নির্বাচন পরিচালনায় পুলিশ সদস্য মাত্র ৯–১০ শতাংশ, যা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত হওয়া নিয়েও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছে।
বিচার ও মানবাধিকার প্রশ্নে অসন্তোষ
প্রতিবেদনে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত এবং র্যাব বিলুপ্তি ও গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার বিষয়ে সরকারের নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাংবাদিকদের ঢালাওভাবে মামলায় জড়ানোর ঘটনাকে বিচারের চেয়ে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ বলেও আখ্যা দেওয়া হয়।
গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রবাহ: উল্টো পথে সরকার
প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশন ও গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশকে সরকার의 ‘বিদায়ি পরিহাস’ বলে উল্লেখ করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, সরকার গণমাধ্যমকে সুরক্ষা দেওয়ার বদলে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়। উপদেষ্টা পরিষদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের ঘোষণাও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
রাজনীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতান্ত্রিক সংস্কার অসম্ভব
টিআইবির মতে, গণতান্ত্রিক সংস্কার সফল করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন।
কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহার কারণে জুলাই সনদ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং গণভোট নিয়েও দেশজুড়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
টিআইবি মনে করে, সরকার চাইলে এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন—
-
মব সন্ত্রাসে জিরো টলারেন্স
-
প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য বিচার
-
স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন
-
গণমাধ্যম ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা
অন্যথায়, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা অপূর্ণই থেকে যাবে।


