ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ে সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শত শত লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই এসব অভিযোগ জমা পড়ে বলে দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগের সংখ্যা ও প্রবাহ দেখে কর্মকর্তাদের ধারণা—এটি রেকর্ড সংখ্যায় পৌঁছাতে পারে।
দুদক সূত্র জানায়, অধিকাংশ অভিযোগে অভিযোগকারীরা নাম প্রকাশ করেননি। তবে কয়েকটি অভিযোগে পূর্ণ নাম-পরিচয়সহ লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। দুদক জানিয়েছে, অন্যান্য অভিযোগের মতো এসব অভিযোগও নিয়ম অনুযায়ী প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজন হলে অনুসন্ধান ও তদন্তে নেওয়া হবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ
সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট আর্থিক অনিয়ম, আয়কর ফাঁকি এবং বিদেশে অর্থ পাচারের দাবি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ট্রাস্ট গঠন করে গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম করা হয়েছে এবং সেই ট্রাস্টের মাধ্যমে পারিবারিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা এখনও যাচাইাধীন।
ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে ‘মামলা ও জামিন বাণিজ্য’ অভিযোগ
সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল–এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের এক ডজনের বেশি অভিযোগ জমা হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
মামলা ও জামিন বাণিজ্য
-
বিচারক পদায়নে অনিয়ম
-
সাব-রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্য
একটি অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, একটি শিল্প গ্রুপ–সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও বিপুল অর্থের বিনিময়ে জামিন নিশ্চিত করা হয়। টেলিভিশন চ্যানেলের এক ব্যক্তির জামিন নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এছাড়া ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিচারক বদলিতে ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। উত্তরা, বাড্ডা, গুলশান ও সাভারের মতো এলাকাগুলোতে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি নিয়েও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ জমা পড়েছে।
পরিবেশ, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য খাতে অভিযোগ
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান–এর বিরুদ্ধে অন্তত আটটি অভিযোগ জমা হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—
-
পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ
-
সম্পত্তি দখলের অভিযোগ
-
তার স্বামীর মাধ্যমে সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ–সংক্রান্ত তদন্তের দাবি
জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান–এর বিরুদ্ধে সামিট গ্রুপসহ কয়েকটি বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম–এর বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি ও হাসপাতাল কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ জমা পড়েছে।
ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে বেশি’ অভিযোগ
সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ–এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে। প্রায় এক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বেশিরভাগ অভিযোগেই অভিযোগকারীরা নাম-ঠিকানাসহ তথ্য-প্রমাণ সংযুক্ত করেছেন বলে জানা গেছে।
তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, কাজ না দেওয়া, বিদেশে অর্থ পাচার এবং বেআইনি বিটকয়েন লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
তথ্য উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও লাইসেন্স বাণিজ্যের অভিযোগ
সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম–এর বিরুদ্ধে টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।
টিআইবি: অভিযোগ আমলযোগ্য হলে তদন্ত হওয়া উচিত
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)–এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
“কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা ও আমলযোগ্যতা থাকলে অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। সত্যতা পেলে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, অতীতেও উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও দুদকের দৃশ্যমান কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়েনি। এখন যেহেতু তারা সরকারে নেই, দুদক চাইলে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে পারে। তবে অভিযোগ যেন হয়রানির অস্ত্র না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
দুদকের অবস্থান
দুদক সূত্র জানিয়েছে, সব অভিযোগই নিয়মমাফিক যাচাই করা হবে। যেসব অভিযোগে প্রাথমিকভাবে তথ্যের ভিত্তি পাওয়া যাবে, সেগুলো অনুসন্ধানে নেওয়া হবে। আর যেগুলো আমলযোগ্য নয়, সেগুলোর ক্ষেত্রেও যুক্তিসহ সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এখন নজর দুদকের তদন্ত প্রক্রিয়ার দিকে—সত্যতা যাচাই শেষে কী পদক্ষেপ নেয় সংস্থাটি, সেটিই সময় বলে দেবে।


