ইব্রাহিম খলিল বাদল

বাংলাদেশের মানুষের জীবনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি যেন এক চিরস্থায়ী দুঃখের নাম। বাজারে অস্থিরতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরা যায়নি। বরং স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বাজার বিশ্লেষণে স্পষ্ট—অর্থনীতির নিয়ম নয়, নিত্যপণ্যের বাজার পরিচালিত হচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিধানে। ডিম, পেঁয়াজ, চাল, ভোজ্য তেল, চিনি, ডাল, মুরগি—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পণ্যই কোনো না কোনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে।
ভাঙেনি পুরোনো সিন্ডিকেট
বিগত সরকারের আমলে যেসব সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল, তাদের ভাঙার কোনো দৃশ্যমান আলামত নেই এখনো। সাম্প্রতিক সময়ে ডিম ও মুরগির বাজারে সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব প্রকাশ্যে এসেছে। সরকার অগ্রাধিকারের কথা বললেও বাস্তবে বাজারব্যবস্থায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বাজারের তথ্য বলছে,
-
ডিম ও পেঁয়াজের দাম সবচেয়ে অস্থির
-
চালের দাম বরং আরও বেড়েছে
-
সবজি, কাঁচা মরিচ, তেল, চিনি—সবখানেই ঊর্ধ্বগতি
এ অবস্থায় দু-একটি পণ্যের সামান্য দাম কমলেও তা সাধারণ মানুষকে কোনো স্বস্তি দিতে পারেনি।
মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য
বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১০ শতাংশের বেশি। কিন্তু উৎপাদনের পর বাজারজাতকরণের ধাপে সবচেয়ে বড় শোষণের শিকার হন কৃষক ও ভোক্তা।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে,
কৃষিপণ্যের মুনাফার প্রায় ৮০ শতাংশ ভোগ করেন মধ্যস্বত্বভোগীরা।
ফড়িয়া, আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নামমাত্র দামে কৃষিপণ্য কিনে দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে বিক্রি করে। ফলে
-
কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না
-
ভোক্তা অতিরিক্ত দাম দিতে বাধ্য হন
আইন থাকলেও মজুতদারি, ভেজাল ও অতিমুনাফার বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান নেই বললেই চলে।
রোজা-ঈদ-বাজেট: দাম বাড়ানোর পুরোনো কৌশল
বাংলাদেশে কোনো অজুহাত পেলেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে—
-
রমজান
-
ঈদ
-
জাতীয় বাজেট
-
রাজনৈতিক অস্থিরতা
এ প্রবণতা নতুন নয়, তবে বর্তমানে তা মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাজারে এখন অর্থনীতির নিয়ম নয়, সিন্ডিকেটের নিয়ম কার্যকর।
রমজান ও নির্বাচন: দ্বিগুণ ঝুঁকি
এ বছর রমজান আসছে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পরপরই। প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গন থাকবে নির্বাচনী ব্যস্ততায়। এই সুযোগে সিন্ডিকেট চক্র যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে—সে বিষয়ে এখন থেকেই সতর্ক না হলে বড় সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
ইতোমধ্যে রাজধানী ও বিভিন্ন অঞ্চলে—
-
কাঁচা মরিচ: ১২০ টাকা কেজি
-
শসা: ১১০–১২০ টাকা
-
টমেটো: ৯০–১০০ টাকা
-
মুরগির দাম সপ্তাহে বেড়েছে ১০–২০ টাকা
রমজানে প্রোটিনের প্রধান উৎস মুরগি যদি নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে ভোগান্তি বহুগুণ বাড়বে।
পাইকারি বাজারে আগাম চাপ
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ বড় পাইকারি বাজারে গত এক সপ্তাহে বেড়েছে—
-
পেঁয়াজ
-
রসুন
-
আদা
-
ছোলা
-
ডাল
-
চিনি
-
ভোজ্য তেল
-
সেমাই
রমজান সামনে রেখে পাইকারি পর্যায়েই তৈরি হচ্ছে মূল্যবৃদ্ধির চাপ।
চট্টগ্রাম বন্দরে জট: সংকটের নতুন উৎস
দাম বাড়ার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলের জট।
-
শতাধিক জাহাজ আটকা
-
৪৫ লাখ টনের বেশি পণ্য খালাসের অপেক্ষায়
-
১২ লাখ টন রমজান-সংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য আটকে আছে
লাইটার জাহাজের সংকটের কারণে যেখানে ৭–১০ দিনে খালাস শেষ হওয়ার কথা, সেখানে এখন লাগছে ২০–৩০ দিন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, এখানেও সক্রিয় একটি পরিবহন সিন্ডিকেট।
রাজনৈতিক আশ্রয়েই শক্তিশালী সিন্ডিকেট
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন,
“যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সিন্ডিকেট চক্র তাদের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠে।”
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণের মূল শর্ত হলো—
-
শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার
-
দলমত নির্বিশেষে অভিযান
-
উৎপাদক ও ভোক্তার সরাসরি সংযোগ
নিত্যপণ্যের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে
-
মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে
-
বন্দরের জট দ্রুত নিরসন করতে হবে
-
আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে
নইলে রমজান ও নির্বাচন সামনে রেখে সাধারণ মানুষ আবারও পড়বে ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধির ফাঁদে—যার খেসারত দিতে হবে প্রতিটি পরিবারকে।
ইব্রাহিম খলিল বাদল
সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


