সোমবার, মে ১১, ২০২৬

শহীদ ওসমান হাদি: ইনসাফের বাংলাদেশ, নৈরাজ্যের বাংলাদেশ নয়

পাঠক প্রিয়

মোঃ খুরশীদ আলম সরকার

লাখো মানুষের ঢল, অশ্রুসিক্ত বিদায় এবং স্তব্ধ হয়ে যাওয়া একটি জাতি—শরিফ ওসমান হাদির জানাজা প্রমাণ করে দিয়েছে, বয়স কিংবা দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নয়; আদর্শ, সততা ও স্বপ্নই মানুষকে অনুকরণীয় করে তোলে। মাত্র ৩২ বছরের জীবনে হাদি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজ দেশের মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত—একটি ‘ইনসাফের বাংলাদেশ’

হাদির ইনসাফের বাংলাদেশ ছিল সহজ, স্পষ্ট ও ন্যায়ভিত্তিক। বৈষম্যহীন সমাজ, মত ও চিন্তার স্বাধীনতা, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং দুর্নীতি ও জুলুমমুক্ত রাষ্ট্র—এই আদর্শেই তিনি বিশ্বাস করতেন। এই স্বপ্ন নতুন কিছু নয়। ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল, সেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াইই নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে আবার উচ্চারিত হয়েছিল ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে।

জুলাই আন্দোলনের অগ্রদূত

’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যের বিরুদ্ধে যারা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন তাঁদের অন্যতম অগ্রদূত। ৫ আগস্টের বিজয়ের পর তিনি বুঝেছিলেন—ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পথ গণতন্ত্রের মধ্য দিয়েই যায়। আর গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। সে বিশ্বাস থেকেই তিনি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং প্রচারণা শুরু করেন।

কিন্তু সেই প্রচারণাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়। প্রচারণার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে এক সপ্তাহ লড়াই শেষে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এক অসময়ে থেমে যায় একটি স্বপ্ন, একটি সংগ্রাম।

হত্যার বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ

১২ ডিসেম্বর গুলিবর্ষণের ঘটনার পর থেকেই হাদির ঘাতকদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয় সর্বস্তরের মানুষ। ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস দিলেও বাস্তবতা হলো—এখন পর্যন্ত প্রধান সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার হয়নি। এই ব্যর্থতা নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন মহল শুরু থেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে।

হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেই ক্ষোভ চূড়ান্ত রূপ নেয়।

নৈরাজ্য ও সহিংসতা: কার লাভ?

১৮ ডিসেম্বর রাতভর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। দুটি সংবাদপত্র অফিসে অগ্নিসংযোগ, ছায়ানট ভবন ও উদীচীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও হামলা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। মব সন্ত্রাস ও জ্বালাও-পোড়াও জনজীবনে সৃষ্টি করে ভয়াবহ আতঙ্ক।

এই সহিংসতা শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও নিন্দিত হয়েছে। বিশেষ করে সংবাদপত্র অফিসে হামলার ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে—এই নৈরাজ্য কার স্বার্থে? নির্বাচন বানচালের জন্য কি পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে? এর পেছনে কি কোনো গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে?

হাদির আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সহিংসতা

একটি বিষয় স্পষ্ট—শরিফ ওসমান হাদি বেঁচে থাকলে এ ধরনের সহিংসতা কখনোই সমর্থন করতেন না। তিনি জানতেন, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার একমাত্র লাভবান হয় গণতন্ত্রবিরোধী ও পতিত স্বৈরাচারী শক্তি। রাতের অন্ধকারে পত্রিকা অফিসে হামলা, আগুন দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ—এসব কখনোই বীর বিপ্লবীর পথ নয়; এগুলো কাপুরুষতার প্রকাশ।

যারা সত্যিকার অর্থে হাদির অনুসারী, যারা ইনসাফের বাংলাদেশে বিশ্বাস করেন, তারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন না।

শোককে শক্তিতে রূপান্তরের আহ্বান

২০ ডিসেম্বর হাদির জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে—এই দেশ তাঁকে ভালোবেসেছে। এই ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানাতে হবে। তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা মানে শহীদ হাদির আত্মত্যাগকে অসম্মান করা।

শোককে শক্তিতে রূপান্তর করাই এখন সময়ের দাবি। ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে হলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র রক্ষা করতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেটি সম্ভব হবে কেবল তখনই, যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।

শরিফ ওসমান হাদি কোনো সহিংস বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেননি। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন ন্যায়, ইনসাফ ও মানুষের অধিকারভিত্তিক একটি রাষ্ট্রের। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ সহিংসতা নয়, ঐক্য ও গণতন্ত্র।

ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে হলে হাদির আদর্শই হতে হবে আমাদের পথনির্দেশক—নৈরাজ্যের বাংলাদেশ নয়।

সর্বশেষ সংবাদ

ময়মনসিংহ ও সিলেটে ৬০ কিমি বেগে ঝড় হতে পারে

অনলাইন ডেস্ক দেশের দুই অঞ্চলে সন্ধ্যার মধ্যে ঝড়ো আবহাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সম্ভাব্য এই দুর্যোগে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০...

ডিএমপিতে পাঁচ পরিদর্শক বদলি

অনলাইন ডেস্ক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পাঁচজন পরিদর্শককে বদলি করা হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (সদরদপ্তর ও প্রশাসন) মো. আমীর খসরুর স্বাক্ষরিত এক আদেশে...

যুদ্ধবিরতির মাঝেই ইরানকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা দিচ্ছে চীন—মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য

অনলাইন ডেস্ক ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই তেহরানকে নতুন করে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন—এমন তথ্য দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। মার্কিন...

হামের প্রাদুর্ভাব: ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত ১৬৯

অনলাইন ডেস্ক দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫...

কাতারে ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড়তে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কাতারসহ বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের জব্দকৃত অর্থ ছাড়তে সম্মত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যদিও...

জনপ্রিয় সংবাদ