বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৬

যে কারণে শিবিরের বিজয় অবিশ্বাস্য বাস্তবতা নয়

পাঠক প্রিয়

ফররুখ খসরু:
শিবিরের উত্থানে শশী থারুরেরা তথা অভিজাত ভারতীয় আর্য নেতৃত্ব আজ শংকিত। এই ভয়টা ঐতিহাসিক, তবে প্রেক্ষাপটটা অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকও বটে। গভীরে আছে একটি রুঢ় আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা।
ডাকসু ও জাকসু বিজয়ীরা কে কোন ডিপার্টমেন্টের? রাকসু ও চাকসুর প্রার্থীরা কে কোন বিষয়ের শিক্ষার্থী? বেশীর ভাগই কলা অনুষদ থেকে আসছে। বিজনেস বা সাইন্স ফেকাল্টি থেকে প্রার্থী নাই বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন অনেকগুলো বিভাগ আছে যেগুলোতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ এতই কম যে তারা মাসেও একবার বই ছুঁয়ে দেখে না, যেখানে অন্য একজন শিক্ষার্থীকে মোটামুটিভাবে পাস করতে হলেও দৈনিক চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পড়াশোনা করতে হয়।

তাহলে এসব না পড়া বিভাগের শিক্ষার্থীরা বাকি সময়ে কী করবে? এক কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন লেখাপড়া বা গবেষণার প্রয়োজন হয় না, লো ইফোর্টেও এখানে ভালো রেজাল্ট করা যায়, তখনই এরা রাজনীতি করতে পারে, নির্বাচন করার মতো সময় হাতে থাকে। সাদিক, ফরহাদ, আবিদ… সব প্রায় সেইম লিগাসি ক্যারি করছে।
বুরোক্র্যাসিতে এডমিন ক্যাডারের অধিকাংশই এই ব্যাকগ্রাউন্ডের। আমাদের সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায়ও একই চিত্র। সমাজে অপিনিয়ন লিডার যারা আছে, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডটা দেখুন। একেবারে প্রান্তিক লেভেলে ইমাম, মুয়াজ্জিন, স্কুল মাস্টার, হেড টিচার, কলেজ টিচার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আমলা, নেতা, জনপ্রতিনিধি প্রায় সবারই একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ডটা অত্যন্ত দূর্বল বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। যোগ্য নেতৃত্বের ভ্যাকুয়ামটা একেবারে রুট থেকেই। যে সমাজে যোগ্য অপিনিয়ন লিডার তৈরি হয় না, সেখানে না পড়ে পাশ করা যায় এমন বিষয়ের শিক্ষার্থীরা ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু নিয়ন্ত্রণ করবে এটাই স্বাভাবিক।
আজকে বাংলাদেশে আমরা শিক্ষার যে ধারাটা ফলো করি তা ঔপনিবেশিক। কওমী ও আলিয়া দুই ধরণের মাদ্রাসা শিক্ষাও এর বাহিরে নয়। ইংরেজকালে ভারতবর্ষে শিক্ষার যে ধারা প্রচলিত ছিল তা স্বাভাবিক কোনো ধারা ছিল না। মাদ্রাসা শিক্ষা ছিল বৃটিশপ্রবর্তিত ধারার প্রতিফল এবং তাদের চক্রান্তের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বিকল্প মাধ্যম অবলম্বন মাত্র। নতুবা ভারতবর্ষে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের প্রবেশের পূর্বে মাদ্রাসা এবং স্কুল নামের দুটি বিভাজিত ধারার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। এতদঞ্চলে ইসলামের সূচনা থেকে বৃটিশ পিরিয়ডের আগ পর্যন্ত বিদ্যালয়গুলোতে একসাথে দ্বীনি এবং জাগতিক দু’ধারার শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন ছিল। অনেকগুলোই ছিল মসজিদ, মাজার ও খানকা কেন্দ্রিক।
১০ম শতাব্দীতে খলিফা আল মামুনের সময়কালে ইরাকে নিযাম প্রতিষ্ঠাসহ ইসলামের ইতিহাসে প্রসিদ্ধ জামেয়া বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পর্যালোচনা করলে মৌলিকভাবে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়কে মধ্যযুগে মুসলিম সমাজের জ্ঞান শিক্ষার আতুড়ঘর বলা যায়। প্রথম সারিতে রয়েছে মারাকেশের জামেয়া কারাউয়্যীন। দ্বিতীয়তে রয়েছে তিউনিসিয়ার জামেয়া যাইতুনিয়া। তৃতীয়তে রয়েছে মিশরের জামেয়া আযহার। অথচ মুসলমানদের আজকের শিক্ষাব্যবস্থা তাদের পূর্বসূরীদের ইতিহাসের ধারায় বর্তমানকে সম্পৃক্ত করছে না। মুসলমানদের আজকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সকল শাস্ত্র সমানভাবে মর্যাদা পায় না যেখানে সবাই একই রঙে রঙীন হবে। আজকের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাও শুধুমাত্র ঔপনিবেশি দাসদের উত্তরসুরি তৈরি করছে।
রাজনৈতিকভাবে ভারতবর্ষের মসনদে থাকা মুসলমান-অমুসলমান সকল শাসকের কাছেই আমরা দক্ষিণ ও পূবের লোকেরা অচ্ছুৎ দ্রাবিড়। প্রাচীনকাল হতেই আর্য বংশদ্ভূত উত্তর ভারতীয় ব্রাক্ষণেরা আমাদের শাসন করে আসছে। ইংরেজ-উত্তর ভারতেও দিল্লীর মসনদ আজো উত্তর ভারতীয় ব্রাক্ষ্মণ্যবাদের দখলে। ব্রাক্ষণ্যবাদী জিন্নাহর পাকিস্তানও এর ব্যাতিক্রম নয়। বাংলাই শুধু ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়ালো। ১৭৫৭ সালে ফিরিঙ্গিদের হাতে বাংলার ভিনদেশী মুসলিম শাসকেরা পরাজিত হলে ভারতবর্ষের আশরাফ-আতরাফ সকল মুসলমানরাই রাজনৈতিকভাবে শক্তিহীন হয়ে পড়ে। মুসলমানদের আত্মিক স্পৃহাকে পরাভূত করতে ইসলামের সামজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক ও বিজ্ঞান শিক্ষাকে উপেক্ষা করে ইংরেজ বদান্যতায় শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার উপর জোর দিয়ে মাদ্ররাসা শিক্ষার প্রসার হতে থাকে। কুরআন-সুন্নাহ এবং ফিকহের একটি বড় বিষয় হল ইজতিহাদ। অথচ প্রচলিত ইসলাম শিক্ষায় গবেষনা আজ অবহেলিত।
মূলতঃ উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমান বিভাজন শুরু হল তখন থেকেই, যখন ইংরেজরা এ দেশে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দিল। মুসলমানদের জন্য মৌলিক বিষয়কে দেশান্তর করে দেওয়া হল। সে সময় মুসলমানরা দ্বীন-ঈমানের ফরযে কিফায়াটুকু হেফাযতের স্বার্থে বাধ্য হয়ে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দারুল উলূম দেওবন্দ ইসলামের খেদমত ও অবদানে যে স্বাক্ষর রেখেছে, উপমহাদেশের ইতিহাসে তার দ্বিতীয়টি বিরল। তবে এটা ছিল প্রয়োজনের স্বার্থে বিকল্প চিন্তা মাত্র। বাস্তবতা হওয়া উচিত ছিল জামেয়া কারাউয়্যীন, জামেয়া যাইতুনিয়া কিংবা জামেয়া আযহার। পরবর্তীতে আলিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠা আরো সুদূর প্রসারি ইসলাম বিরোধী ইংরেজ চক্রান্ত মাত্র।
ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে স্বাধীনতার আকাংখা যত তীব্রতর হতে থাকে, মুসলমানরাও তাদের নেতা খুঁজতে থাকে। এমনই বাস্তবতার আলোকে মুসলমানদের নেতা হিসেবে ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী জিন্নাহর উত্থান হলেও তিনি কখনোই আতরাফ বাঙালী মুসলমানের নেতা হয়ে উঠতে পারেন নাই। মূলতঃ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব বঙ্গীয় আতরাফ মুসলমানরা তাদের জন্য নেতা খুঁজতে থাকে। ইংরেজ ও উত্তর ভারতীয় ব্রাক্ষ্মণ্য শক্তি তাদের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতির আলোকে সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী এবং দেওবন্দী আলেমদের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য জিন্নাহর বিকল্প নেতা বানানের চেষ্টা করলেও বাংলার মুসলমান সমাজ তাদের প্রত্যাখ্যান করে পাকিস্তানের পক্ষে রায় দেয়।
১৯৭১ সালে বাংগালি মুসলমানদের সমুহ নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের আবির্ভাব হলেও অতি ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী আর্য-নীতির প্রতি ঝুঁকে পড়ার কারণে তিনি জনমানস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আশির দশকের শুরুতেই জিয়াউর রহমানের অকাল প্রয়াণ বাংঙ্গালী মুসলমানকে আরো নেতৃত্বহীন করে তোলে। এ সময়ে উপমহাদেশে সমাজতন্ত্রকে রুখতে গিয়ে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ তথাকথিত ইসলামিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া শুরু করে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত পুতুল সরকার নজিবুল্লাহর পতন ঘটাতে তালেবান-মুজাহিদদের অর্থ ও অস্ত্র পৃষ্ঠপোষকতা পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে আনুষ্ঠানিকতা নির্ভর ইসলামিক জ্ঞানের প্রসার ঘটায়। এ অঞ্চলের মুসলমানরা বিজ্ঞানভিত্তিক গৌরবান্বিত অতীত ইসলামি শিক্ষার বিপরীতে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক আচার-আচরণ কেন্দ্রিক বাহ্যিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
তদুপরি রয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। জমিদারি প্রথা অবসানের পর এক ধরণের জোতদারি (গ্রামিন এলিট সোসাইটি) এখনো বাংলার গ্রামিন সমাজে বিদ্যমান। আছে সুযোগ সন্ধানী মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা। স্বাধীনতার পর একটা আধা-বুর্জোয়া সমাজে অর্থনীতির ভিত্তি দাঁড়ায় আদম বেপারি ( মেন পাওয়ার) ও জমির দালালি ( রিয়েল এস্টেট) ব্যবসা। শিল্পায়নের সুযোগ থাকলেও পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে বেড়ে উঠে পোষাক শিল্প। ট্র্যাডিশনাল কারণেই (মসলিন) আমরা এটাতে সহজেই মানিয়ে যাই। বাড়তি পাওনা হলো রেমিট্যান্স। অভ্যন্তরিন চাহিদাকে ভিত্তি করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ না হওয়ায় অর্থনীতি হয়ে পড়েছে বিদেশ নির্ভর। রপ্তানি পণ্যের ডাইভার্সিটি নাই, নতুন বাজার সৃষ্টির উদ্যোগও নাই। শহুরে মধ্যবিত্তরা বড় হচ্ছে কালো টাকার ছায়ায়।
অন্যদিকে, আশির দশক থেকে শুরু হওয়া রেমিট্যান্স এর কারণে তৈরি হয়ছে একটা নতুন অর্ধশিক্ষিত গ্রামীণ মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মননে মেধায় এরা ষাটের দশকে বেড়ে উঠা বাংগালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির একবারে বিপ্রতীব। বিশ্বায়ন ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আশির্বাদে এরা পুঁজিবাদী প্রলোভনের শিকার হচ্ছে হর-হামেশাই। বিশাল ভোক্তা বাজারে নারী ক্রমান্বয়ে পণ্য হয়ে উঠার ঝুঁকিতে নিরাপত্তা খুঁজে নিচ্ছে ধর্মের ছায়ায়। তাই শহুরে মধ্যবিত্ত ঘরের নারীরা আজ গ্রাম থেকে উঠে আসা ধর্ম শিক্ষায় শিক্ষিত নতুন গ্রামীণ মধ্যবিত্তকে স্বাগতম জানাচ্ছে। ডাকসু, জাকসু, রাকসু কিংবা চাকসু কোন কিছুই ব্যতিক্রম নয়।
রেমিট্যান্স এর কারণে গ্রামীন সমাজে বেড়ে উঠা মধ্যবিত্তরা শহরের নেতৃত্বে আসছে, মাদ্রাসা শিক্ষায় দীক্ষিত সাদিক কাইয়ুম, ফরহাদ, আবিদদের দিকে শহুরে মধ্যবিত্তের অসহায় চেয়ে থাকা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই।

(লেখক সিনিয়র সাংবাদিক)।

সর্বশেষ সংবাদ

ময়মনসিংহ ও সিলেটে ৬০ কিমি বেগে ঝড় হতে পারে

অনলাইন ডেস্ক দেশের দুই অঞ্চলে সন্ধ্যার মধ্যে ঝড়ো আবহাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সম্ভাব্য এই দুর্যোগে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০...

ডিএমপিতে পাঁচ পরিদর্শক বদলি

অনলাইন ডেস্ক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পাঁচজন পরিদর্শককে বদলি করা হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (সদরদপ্তর ও প্রশাসন) মো. আমীর খসরুর স্বাক্ষরিত এক আদেশে...

যুদ্ধবিরতির মাঝেই ইরানকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা দিচ্ছে চীন—মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য

অনলাইন ডেস্ক ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই তেহরানকে নতুন করে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন—এমন তথ্য দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। মার্কিন...

হামের প্রাদুর্ভাব: ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত ১৬৯

অনলাইন ডেস্ক দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫...

কাতারে ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড়তে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কাতারসহ বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের জব্দকৃত অর্থ ছাড়তে সম্মত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যদিও...

জনপ্রিয় সংবাদ