অনলাইন ডেস্ক

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ২৭ জানুয়ারি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিতে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রফতানি খাতে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নতুন ব্যবস্থায় মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের ওপর কার্যকর শুল্ক ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হলেও বাংলাদেশি পণ্যের ক্ষেত্রে তা এখনো ২০ শতাংশ রয়ে গেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রধান রফতানিকারক দেশের মধ্যে মূল্যগত ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই শুল্কবৈষম্য দীর্ঘস্থায়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে বেসিক টি-শার্ট, নিটওয়্যার ও ক্যাজুয়াল পোশাকের অর্ডার ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রফতানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছে ভারত তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে। পাশাপাশি দেশটি কাঁচামালের সহজলভ্যতা, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা ও কম লিড টাইমের সুবিধা দিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, টানা তিন মাস ধরে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি কমছে। একই সময়ে প্রতিযোগী দেশগুলো নতুন বাণিজ্য সুবিধা অর্জনের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। এর ফলে বাংলাদেশের রফতানি খাত একটি নতুন সংকটের মুখে পড়েছে।
তাঁরা আরও সতর্ক করে বলেন, ২০২৬ সালের পর ইউরোপীয় বাজারে যদি জিএসপি সুবিধা না থাকে, তবে দেশের রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসন, কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাণিজ্য কৌশল গ্রহণ জরুরি হয়ে উঠেছে।
তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, মাত্র ১–২ শতাংশ শুল্ক পার্থক্যও আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। ভারতের শুল্ক কমার ফলে দেশটি দামে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের টি-শার্ট, নিটওয়্যার ও ক্যাজুয়াল পোশাকের অর্ডার হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।
শুল্কবৈষম্যের কারণে কারখানাগুলোর সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে বলে মনে করেন পোশাক খাতের নেতারা। একদিকে দাম কমিয়ে অর্ডার ধরে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে লাভের মার্জিন সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি। উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং ব্যাংকঋণের চাপের মধ্যে থাকা কারখানাগুলোর জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ভারত নয়টি বড় বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যা তাদের রফতানি খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে গেছে। বিপরীতে বাংলাদেশের কার্যকর বাণিজ্য চুক্তি মাত্র একটি—ভুটানের সঙ্গে। জাপানের সঙ্গে আরেকটি চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, ভারতের সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পূর্ণাঙ্গ টেক্সটাইল ও পোশাক ইকোসিস্টেম, শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনের ফল।
রুবেল আরও বলেন, বাংলাদেশের উচিত আক্ষেপে আটকে না থেকে কোথায় পিছিয়ে পড়েছে তা চিহ্নিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পথ খোঁজা। তিনি লক্ষ্যভিত্তিক এফটিএ বা সিইপিএ কৌশল, উচ্চ মূল্য সংযোজন, লজিস্টিকস ও বন্দর দক্ষতা বৃদ্ধি, নীতি-স্থিতিশীলতা এবং দক্ষ মানবসম্পদে বিনিয়োগের ওপর জোর দেন।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে ইহসান শামীম বলেন, ভারতের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক ১৮ শতাংশে নেমে আসায় বাংলাদেশ নতুন প্রতিযোগিতার সংকটে পড়েছে। বর্তমানে শুল্ক কাঠামো অনুযায়ী, ভারতের ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ এবং পাল্টা শুল্ক ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ যোগ হয়ে মোট শুল্ক দাঁড়াচ্ছে ৩৫ শতাংশে।
তিনি বলেন, এর ফলে দেশের উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারাচ্ছেন এবং ক্রেতারা কম দামে পণ্য সরবরাহের চাপ সৃষ্টি করছেন। এই অবস্থায় তিনি সরকারের প্রতি দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার ও নীতি সহায়তা বৃদ্ধির আহ্বান জানান, যাতে বাংলাদেশের রফতানি খাত আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে পারে।
সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ


