ইশতিয়াক মাহমুদ মানিক

১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে বিএনপি এখন শেষ পর্যায়ে তাদের নির্বাচনি ইশতেহার চূড়ান্ত করছে। দলটি রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদকে সমন্বয় করে এই ইশতেহার প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ইশতেহারের মূল লক্ষ্য দেশের সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা।
বিএনপি ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সংলাপ ও আলোচনা চালিয়ে ইশতেহারকে আরও বাস্তবমুখী ও ফলপ্রসূ করার চেষ্টা করছে। জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপির ইশতেহার হবে দেশের মৌলিক গণতান্ত্রিক সংস্কার, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহায়তা
ইশতেহারের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষক কার্ড।
-
ফ্যামিলি কার্ড: প্রতি মাসে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকার আর্থিক সহায়তা বা খাদ্য ও নিত্যপণ্য সুবিধা।
-
কৃষক কার্ড: ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক, সরকারি ভর্তুকি, কৃষি যন্ত্রপাতি, স্বল্প মূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বিমা, মোবাইলে আবহাওয়া ও ফসলের রোগ প্রতিকার সম্পর্কিত তথ্যসহ মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারির জন্যও সুবিধা।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন
বিএনপির পরিকল্পনায় দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং নতুনভাবে প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে, যার ৮০% নারী হবে। এছাড়া প্রতিটি মহানগর ও জেলা শহরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
শিক্ষা খাতের জন্য বিএনপি একটি আনন্দময় শিক্ষা এবং দক্ষ জনশক্তি গঠনের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
-
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও কম্পিউটার-ট্যাব সরবরাহ।
-
মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা, টিম-ওয়ার্ক, পার্সোনাল স্কিল, সাংস্কৃতিক শিক্ষা।
-
তৃতীয় ভাষা (আরবি, জাপানিজ, কোরিয়ান, ইতালিয়ান, ম্যান্ডারিন) শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি।
-
খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে শিক্ষার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
ক্রীড়া, পরিবেশ ও জল সম্পদ উন্নয়ন
বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া বাধ্যতামূলক করা হবে, ১২-১৪ বছর বয়সী প্রতিভাবান ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হবে এবং ৬৪ জেলায় স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে। এছাড়া দেশের খাল, নদী খনন ও পুনঃখনন, তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজ উন্নয়ন এবং পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণসহ সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে সহায়তা
খতিব, ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়ের প্রধানদের মাসিক সম্মানি, উৎসব ভাতা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানসহ দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
প্রচার ও জনগণকে সম্পৃক্তকরণ
ইশতেহারের প্রচার কার্যক্রমে মূল দল এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা মাঠে নামবে। ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে বিস্তারিত তথ্য পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে তারা স্বচ্ছ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বিগত দেড় যুগের রাজনীতি সাধারণ মানুষের জীবনে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিএনপির এই ইশতেহার শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতির স্তরে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ক্ষমতায় এলে সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা হিসেবে কাজ করবে। এটি তরুণ প্রজন্মকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি দেশের মৌলিক গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করবে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ ও ক্রীড়ার পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বহন করছে। এটি দেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্য রাখছে। ভোটাররা ইতোমধ্যেই ইশতেহারের মাধ্যমে বিএনপির পরিকল্পনা ও প্রাধান্য বোঝার সুযোগ পাচ্ছেন, যা ভোটের সময় জনগণের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।


