অনলাইন ডেস্ক

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসে নতুন করে সংক্রমণের ঘটনা নিশ্চিত হওয়ার পর এশিয়ার একাধিক দেশের বিমানবন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সম্ভাব্য ভাইরাস বিস্তার ঠেকাতে থাইল্যান্ড, নেপাল, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ ভারত থেকে আসা যাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং জোরদার করেছে।
ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত এক মাসে পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসে দুটি সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হলেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। আক্রান্তদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করা হলেও তাদের সংস্পর্শে আসা প্রায় ২০০ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত নতুন কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।
কী এই নিপাহ ভাইরাস
নিপাহ ভাইরাস একটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ানো (জুনোটিক) ভাইরাস। সাধারণত ফলখেকো বাদুড় ও শূকরের মাধ্যমে এ ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করে। আক্রান্ত প্রাণীর নিঃসরণ বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।
মানুষের শরীরে প্রবেশের পর চার থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত ভাইরাসটি সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে দেখা যায় উচ্চ জ্বর, বমি, বমিভাব ও শ্বাসকষ্ট। পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি হয়ে খিঁচুনি, অচেতনতা ও স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিপাহ ভাইরাসকে উচ্চ ঝুঁকির মহামারি-সৃষ্টিকারী ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং এখনো এর কোনো কার্যকর টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। এ ভাইরাসে মৃত্যুহার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত, যা কোভিড-১৯-এর তুলনায় অনেক বেশি।
আগের প্রাদুর্ভাব
নিপাহ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায়। ওই সময় শূকর খামারিদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। যে গ্রামে প্রথম ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছিল, সেখান থেকেই এর নামকরণ করা হয়।
এরপর বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনসসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রায় প্রতিবছরই নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশে এ ভাইরাস নিয়মিতভাবে শনাক্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কাঁচা খেজুরের রস পান করার সঙ্গে নিপাহ সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, কারণ ফলখেকো বাদুড়ের নিঃসরণের মাধ্যমে ভাইরাসটি রসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ভারতে প্রথম নিপাহ সংক্রমণ ধরা পড়ে ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গে, যা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা। পরে ২০১৮ সালে কেরালায় নিপাহ ভাইরাসে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালেও কেরালায় আরও দুটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০৭ সালের পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা, ল্যাব পরীক্ষার সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
এদিকে সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়ে ছড়ানো গুজবকে ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে ভারত সরকার। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া ভারত থেকে আগত যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, তাপমাত্রা পরিমাপ এবং স্বাস্থ্য ঘোষণা বাধ্যতামূলক করেছে। মিয়ানমার পশ্চিমবঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। চীনও সীমান্ত এলাকায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


