বাসস
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের স্বার্থে অপতথ্য (Disinformation/Misinformation) একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ, ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ও মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা ভোটার আচরণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা ও অপতথ্য মনিটরিং সেল গঠন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পন্ন বাহিনী ও সংস্থাসমূহের সমন্বয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। এ প্রতিবেদনে অপতথ্য মোকাবিলায় প্রস্তাবিত কাঠামো, দায়িত্ব, প্রযুক্তিগত সহায়তার ধরন ও বাস্তবায়ন কৌশল উপস্থাপন করা হলো।
এই প্রতিবেদনের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ হলো—
- নির্বাচন ও গণভোট চলাকালীন অপতথ্যের উৎস শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করা।
- অপতথ্যের দ্রুত বিস্তার রোধ এবং এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা।
- নির্বাচন কমিশনকে সময়োপযোগী তথ্য, বিশ্লেষণ ও সতর্কবার্তা প্রদান করা।
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা।
- ভোটারদের মধ্যে আস্থা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
আইনশৃঙ্খলা ও অপতথ্য মনিটরিং সেলের কাঠামো
মনিটরিং সেলটি নিম্নোক্ত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে—
- নির্বাচন কমিশন সচিবালয়
- সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ
- বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)
- পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা দলসহ সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
- প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত ইউনিট
সেলটি প্রাথমিকভাবে সীমিত আকারে গঠিত হবে এবং ভোটের সময় ৭ দিনের জন্য (নির্বাচনের আগে ৪ দিন, ভোটের দিন ও ভোটের পর ২ দিন) পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
কার্যকাল ও অপারেশনাল সময়সীমা
- কার্যকাল: তফসিল ঘোষণার দিন হতে ভোটের পরবর্তী ২ দিন (১২ ডিসেম্বর ২০২৫ হতে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত)।
- পূর্ণাঙ্গ অপারেশন: ভোটের সময়কালীন ৭ দিন বিশেষ গুরুত্বসহকারে।
প্রযুক্তিগত সহায়তার ধরন
অপতথ্যের প্রভাব ও বিস্তার রোধে নিম্নোক্ত প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে—
ডিজিটাল মনিটরিং
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স/টুইটার, টিকটক ইত্যাদি) পর্যবেক্ষণ।
- অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ব্লগ মনিটরিং।
- মেসেজিং অ্যাপভিত্তিক (হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, টেলিগ্রাম) গুজব শনাক্তকরণ প্রবণতা বিশ্লেষণ।
ডাটা বিশ্লেষণ ও সতর্কতা
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে অপতথ্যের ট্রেন্ড বিশ্লেষণ।
- ভুয়া অ্যাকাউন্ট, বট নেটওয়ার্ক ও সমন্বিত অপপ্রচারণা শনাক্ত করা।
- সম্ভাব্য সহিংসতা বা আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নের পূর্বাভাস প্রদান।
দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা
- অপতথ্য শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট বাহিনী ও কমিশনকে অবহিত করা।
- প্রয়োজনে বিটিআরসি ও আইনানুগ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কনটেন্ট টেকডাউন বা সীমিতকরণ।
- নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত সত্য তথ্য দ্রুত প্রচারের ব্যবস্থা।
সমন্বয় ও ফোকাল পয়েন্ট ব্যবস্থা
- সংশ্লিষ্ট কমিশন, মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও বাহিনী/সংস্থা থেকে একজন করে যোগ্য প্রতিনিধি ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে মনোনীত থাকবেন।
- ফোকাল পয়েন্টগণ নির্বাচন কমিশনের সমন্বয় সেলের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করবেন।
- তথ্য আদান-প্রদান, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্রুততা নিশ্চিত করা হবে।
প্রতিবেদন ও নথিভুক্তকরণ
- দৈনিক পরিস্থিতি প্রতিবেদন (Situation Report) প্রস্তুত করা হবে।
- গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, অপতথ্যের ধরন, উৎস ও গৃহীত পদক্ষেপ নথিভুক্ত করা হবে।
- নির্বাচন শেষে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হবে।
অপতথ্য একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী হুমকি, যা সুষ্ঠু নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা ও অপতথ্য মনিটরিং সেল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পন্ন বাহিনী ও সংস্থাসমূহের সমন্বিত উদ্যোগ অপতথ্যের প্রভাব ও বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে ভোটারদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।



