নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান লাগাতার কর্মবিরতি এবং জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুতর সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি দ্রুত নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দেশের শীর্ষ ১০টি বাণিজ্য সংগঠনের নেতারা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতিতে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ), মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ, বিজিএমইএ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, বিজিএপিএমইএ সভাপতি মো. শাহরিয়ার, বিজিবিএ সভাপতি মো. আব্দুল হামিদ এবং বিটিটিএলএমইএ সভাপতি এম শাহাদাত হোসেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এই প্রথম জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বন্দর একদিন বন্ধ থাকলে অর্থনীতিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয়। ফলে তৈরি পোশাকসহ সব খাতের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে এবং দেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
নেতারা বলেন, রপ্তানি খাতের কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে না পারায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্য বন্দরে আটকে থাকায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প সোর্সিংয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই শিল্প খাত সংকটের মুখে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে। এর মধ্যে বন্দর অচল থাকায় কনটেইনার জট তৈরি হয়েছে, যার ফলে ডেমারেজ চার্জ, পোর্ট চার্জ এবং স্টোরেজ খরচ বাড়ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের দামও বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সামনে পবিত্র রমজান মাস। এ অবস্থায় আমদানিকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে পৌঁছাতে বিলম্ব হলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
এছাড়া বন্দর অচল থাকায় ব্যাংক ঋণ ও এলসি ব্যবস্থাপনাতেও অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। সময়মতো শিপমেন্ট না হলে ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারেন, যা পুরো আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বাণিজ্য নেতারা বলেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে দ্রুত সংকট সমাধান করতে হবে। এনসিটি ইজারা সংক্রান্ত জটিলতা থাকলে নতুন সরকার তা পুনর্বিবেচনা করতে পারে, তবে বন্দর অচল রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
একই সঙ্গে বন্দর শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া জানানোর অধিকার আছে, তবে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া দেশের অর্থনীতিকে বিপদের মুখে ফেলে দিচ্ছে। দেশের স্বার্থ বিবেচনায় দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসার আহ্বান জানান তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং আসন্ন রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে যেতে পারে। নতুন সরকারের জন্যও এটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


