বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৩, ২০২৬

ঋতুবর্তী নারী কি সত্যিই অপবিত্র?

পাঠক প্রিয়

ফকির রাসেল
ঋতুবর্তী নারী অপবিত্র। প্রতিবেদনটিতে এই অপবিত্রতার ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে আধ্যাত্মিক সত্যের অন্বেষণ করা হয়েছে। মানুষের সভ্যতা যত এগিয়েছে, ততই কিছু মৌলিক সত্যকে সে ভুলে যেতে শিখেছে। বিশেষ করে নারী ও তার শরীরকে ঘিরে সমাজ এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে, যেখানে স্বাভাবিকতাকে লজ্জা, সৃষ্টিকে অপবিত্রতা এবং শক্তিকে দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঋতুকালীন সময় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। অথচ এই সময়টাই নারীর শরীরে প্রকৃত অর্থে সৃষ্টির ধ্বনি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।
ঋতুকালীন সময়ে একজন নারীকে যে সেবা করে, যে তাকে সম্মান করে, তার কষ্টকে বোঝে, সে কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, সে সেবা করে জগৎজননী শক্তিকেই। কারণ, নারী তখন কোনো সামাজিক ধারণার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না; সে তখন প্রকৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। এই সময় নারী অপবিত্র নয় বরং সে তখন সৃষ্টির উৎসের আরও কাছে অবস্থান করে, তাই সে আরও পবিত্র।
সমাজ আমাদের শিখিয়েছে এই সময়কে আড়াল করতে, গোপন করতে, লজ্জা পেতে। আমরা যে স্থানকে ঘৃণা করি, যে স্থানকে “অপবিত্র” বলে চিহ্নিত করি, সেই স্থান থেকেই আমাদের অস্তিত্বের সূচনা, এই সত্যটি আমরা ইচ্ছাকৃতভাবেই ভুলে থাকি। মানুষ যে দেহকে ‘আমি’ বলে দাবি করে, যে দেহ নিয়ে অহংকার করে, সেই দেহের প্রবেশপথ এই একই জন্মদ্বার। এখানে প্রশ্ন ওঠে সৃষ্টির দ্বার কীভাবে অপবিত্র হয়? অপবিত্রতা কি দেহে, নাকি দৃষ্টিতে?
আধ্যাত্মিক দেহতত্ত্ব বলে, নারীর শরীরের জন্মদ্বারে তিনটি প্রধান নাড়ির সক্রিয় অবস্থান রয়েছে—ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না। এই তিনটি নাড়ি কেবল শারীরিক গঠন নয়, এগুলো শক্তির প্রবাহপথ। ইড়া হলো শীতল, চন্দ্রশক্তি; পিঙ্গলা হলো উষ্ণ, সূর্যশক্তি; আর সুষুম্না—এই দুই শক্তির মিলনস্থল, যেখানে চেতনা জাগ্রত হয়। এই মিলনস্থলকেই আধ্যাত্মিক ভাষায় বলা হয় ত্রিবেণীর ঘাট।
ত্রিবেণীর ঘাট কোনো ভৌগোলিক স্থান নয় এটি দেহের ভেতরের এক মহাতীর্থ। যেমন গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর মিলনে সৃষ্টি হয় মহাপবিত্র ত্রিবেণী, তেমনি ইড়া–পিঙ্গলা–সুষুম্নার মিলনে সৃষ্টি হয় জীবনের প্রবাহ। নারীর ঋতুকালীন সময়ে এই ত্রিবেণীতে প্রতি মাসে এক ধরনের জোয়ার আসে। এটি রক্তের জোয়ার নয় এটি শক্তির জোয়ার, এটি সৃষ্টির আহ্বান।
এখানেই ধ্বনিতত্ত্বের গভীরতা প্রকাশ পায়। এই জোয়ার নিঃশব্দ নয়। যদিও কানে শোনা যায় না, কিন্তু চেতনায় এর ধ্বনি প্রবাহিত হয়। এই ধ্বনি হলো ‘সৃষ্টি-মন্ত্র’। যেমন ওঁ ধ্বনি থেকে ব্রহ্মাণ্ডের বিস্তার, তেমনি নারীর দেহে এই ঋতুধ্বনি থেকেই জীবনের সম্ভাবনা জন্ম নেয়। যে সমাজ এই ধ্বনিকে অপবিত্র বলে, সে আসলে সৃষ্টির মূল কম্পনকেই অস্বীকার করে।
যোগ সাধনা না করলে এই বিষয়গুলো বোঝা কঠিন। কারণ, যোগ মানে কেবল শরীর বাঁকানো নয়; যোগ মানে দেহের ভেতরের ধ্বনি শোনা, শক্তির গতিপথ উপলব্ধি করা। যোগ সাধনায় মানুষ শেখে কীভাবে ইড়া ও পিঙ্গলার দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে সুষুম্নায় প্রবেশ করতে হয়। আর যে এই পথে হাঁটে, সে নারী ও পুরুষ উভয়কেই শক্তির প্রকাশ হিসেবে দেখতে শেখে, ভোগের বস্তু হিসেবে নয়।
যখন জ্ঞান জাগে, তখন লজ্জা ভেঙে যায়। তখন নারী আর “রজঃস্বলা” হয়ে সমাজের বাইরে থাকে না বরং সে হয়ে ওঠে জীবনের ধারক। তখন সেবা আর দয়া নয়, সেবা হয়ে ওঠে সাধনা। তখন নারীর পাশে দাঁড়ানো মানে কেবল মানবিকতা নয়, তা হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক উত্তরণ।
এই উপলব্ধিই মানুষকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। মুক্তি মানে দেহ ত্যাগ নয়, মুক্তি মানে ভ্রান্ত ধারণা ত্যাগ। যখন মানুষ দেহকে অপবিত্র বলে না, নারীত্বকে দুর্বলতা বলে না, আর ঋতুকে লজ্জা বলে না, ঠিক তখনই তার চেতনার বন্ধন আলগা হতে শুরু করে।
 
জ্ঞানময় হওয়া মানেই সবকিছু জানার দাবি করা নয়; জ্ঞানময় হওয়া মানেই সৃষ্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জন্মানো। আর যে এই শ্রদ্ধার পথে হাঁটে, সে ধীরে ধীরে বুঝে যায় নারী কেবল মানুষ নয়, নারী হলো চলমান তীর্থ; তার শরীর কোনো অপবিত্র স্থান নয়, বরং তা এক জীবন্ত ত্রিবেণী, যেখানে প্রতিমাসে সৃষ্টির ধ্বনি নীরবে বেজে ওঠে।

সর্বশেষ সংবাদ

‘সার্ভিস’ শব্দের বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু কী মানুষের মুক্তি ঘটেছে?

সুফি সাগর সামস্ ভাষা, ক্ষমতা ও মানবমর্যাদা নিয়ে একটি পুনর্বিবেচনা সভ্যতার ইতিহাসে শব্দ কখনো কেবল শব্দ নয়; তারা একটি যুগের সামাজিক...

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ, জরুরি সংবাদ সম্মেলন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, শুক্রবার: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন জাতীয় সংসদের...

মানবমস্তিষ্ক: মহাবিশ্বের ভেতর আরেক মহাবিশ্ব

সুফি সাগর সামস্ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি কি কোনো নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা কৃষ্ণগহ্বর? হয়তো নয়। হয়তো সবচেয়ে বিস্ময়কর কাঠামো হলো মানবমস্তিষ্ক—কারণ এই ক্ষুদ্র জৈবিক অঙ্গই সমগ্র মহাবিশ্বকে...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে গেলে স্বাধীনতার মূল্যবোধও হারাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা না গেলে একসময় স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধও হারিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ...

এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না : ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশৃঙ্খল করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে...

জনপ্রিয় সংবাদ