অনলাইন ডেস্ক

ঢাকা, ২৯ মার্চ: বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সমস্যা সমাধানে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে ফেরাতে বন্ধ কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া হবে।
রবিবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কনফারেন্স কক্ষে ব্যবসায়িক সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
বন্ধ শিল্প পুনরুদ্ধারে জোর
গভর্নর বলেন, আগে বন্ধ হওয়া কারখানার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়েও কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানাকে কীভাবে আবার উৎপাদনে আনা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে পারে। এতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়বে এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। অন্যথায় শিল্পসম্পদ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিনিয়োগ আস্থা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং
দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আস্থা সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে গভর্নর জানান, বড় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা হচ্ছে এবং তাদের সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, কোনো ধরনের চাপ গ্রহণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে উদ্যোগ
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মামলা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দেওয়ানি মামলা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় এ ধরনের অর্থ ফেরত আনা কঠিন, তবুও আমানতকারীদের স্বার্থে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানান গভর্নর।
স্টার্টআপ তহবিল ও কর্মসংস্থান
৬০০ কোটি টাকার একটি স্টার্টআপ তহবিল চালুর ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, এপ্রিল থেকে কার্যক্রম শুরু হয়ে জুন থেকে ঋণ বিতরণ শুরু হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম স্টার্টআপগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সামষ্টিক অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা
অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন গভর্নর। তিনি বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সক্রিয় করে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ইসলামী ব্যাংক ও সেবার মান উন্নয়ন
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকটির কার্যক্রম শক্তিশালী করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভিস স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করে সেবার মান বাড়ানোর দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট: প্রস্তুতি ও ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলায় প্রস্তুতির কথা জানিয়ে গভর্নর বলেন, যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদে চললে আমদানি ব্যয় মেটাতে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তিনি জানান, ব্যালান্স অব পেমেন্টে চাপ কমাতে ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আসন্ন ঈদুল আজহা কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স ২ থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। জুনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সতর্কতা
তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেন গভর্নর। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের দেশে ফেরত আসার সম্ভাবনা তৈরি হলে রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে এবং দেশে কর্মসংস্থানের ওপর চাপ বাড়বে। এছাড়া জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানোর চাপ মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা বাজেট ঘাটতি বাড়াতে পারে।
অন্যান্য পদক্ষেপ
কৃষিখাতে সহায়তা বাড়াতে কৃষিঋণ সম্প্রসারণ এবং নতুন পুনরর্থায়ন স্কিম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে আগামী ১ জুলাই থেকে বাংলা কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গভর্নর সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগ স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও জবাবদিহিমূলক ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।


