মোঃ খুরশীদ আলম সরকার

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। কিন্তু টানা কর্মবিরতি ও আন্দোলনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, আটকে পড়ছে জাহাজ, আর বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে ব্যবসা ও শিল্পখাত।
এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বন্দরে পণ্য ওঠানামা প্রায় বন্ধ ছিল। শত শত জাহাজ বহির্নোঙরে অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছে। এতে বিদেশি শিপিং কোম্পানিগুলোও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় এমন অবস্থা চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংকটের মূল কারণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলনে নামেন। তাদের অভিযোগ—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যথাযথ আলোচনা হয়নি।
অন্যদিকে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, অপারেটর কে হবে সেটি তাদের প্রধান উদ্বেগ নয়; তাদের লক্ষ্য দ্রুত পণ্য ওঠানামা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে সামনে নির্বাচন, দীর্ঘ ছুটি এবং রমজান—এই তিনটি বিষয় সরবরাহ চেইনকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
শিল্পখাত বিশেষ করে গার্মেন্টস খাত সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। কারণ উৎপাদন ও রপ্তানি সময়সূচি বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
সরকারি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সাময়িকভাবে কর্মবিরতি স্থগিত হলেও এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত সমাধান না হলে দেশের অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর সংকট: সিদ্ধান্তহীনতা ও নীতিগত দুর্বলতার মূল্য দিচ্ছে দেশ
চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান অচলাবস্থা শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের দুর্বলতার প্রতিফলন। দেশের অর্থনীতির প্রধান লাইফলাইন সপ্তাহের পর সপ্তাহ অচল থাকার পরও সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া প্রশ্নের জন্ম দেয়।
যে কোনো বড় অর্থনৈতিক অবকাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সঙ্গে নেওয়া জরুরি। কিন্তু এনসিটি ইজারা ইস্যুতে সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ার অভাব স্পষ্ট হয়েছে। ফলে একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত শ্রমিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে, আর তার মূল্য দিচ্ছে পুরো দেশ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই সংকট এমন সময়ে তৈরি হয়েছে যখন সামনে নির্বাচন, রমজান এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের চাপ রয়েছে। এমন সময়ে বন্দর অচল থাকা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তা এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়ায়।
সরকারের দেরিতে প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। শুরুতেই কার্যকর মধ্যস্থতা হলে হয়তো এত বড় অচলাবস্থা তৈরি হতো না।
চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি বাণিজ্য কেন্দ্র নয়—এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অংশ। তাই এ ধরনের কৌশলগত স্থাপনা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণমূলক আলোচনা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে একটি স্থায়ী নীতিমালা ও সংকট ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।


