মোঃ খুরশীদ আলম সরকার

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মীকে জাপানে নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার বড় সুযোগ রয়েছে।
রবিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাপানের সাবেক ফার্স্ট লেডি আকিয়ে আবে এবং জাপানি উদ্যোক্তাদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি এ আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ভবিষ্যতে তাঁর রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার কিংবা কোনো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পদে থাকার কোনো ইচ্ছা নেই।
শান্তি ও পুনরুদ্ধারে নেতৃত্বের প্রশংসা
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে আকিয়ে আবে বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অধ্যাপক ইউনূসের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সংকটকালীন সময়ে বাংলাদেশ যে দিকনির্দেশনা পেয়েছে, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ সহযোগিতা
বৈঠকে বিনিয়োগ, সামুদ্রিক গবেষণা এবং জাপানে পরিচর্যাকারী ও নার্স নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। জাপানে দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কেয়ারগিভার ও নার্সসহ স্বাস্থ্যখাতে জনবলের চাহিদা বাড়ছে—এ বিষয়টি বৈঠকে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।
অধ্যাপক ইউনূস জানান, জাপানে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে হাজার হাজার নার্স ও কেয়ারগিভারকে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ জোরদার করেছে। পাশাপাশি জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি কর্মীকে জাপানে পাঠানোর লক্ষ্যে জাপানি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এ সংখ্যা আরও বাড়াতে তিনি আকিয়ে আবে ও জাপানি প্রতিনিধিদলের সহযোগিতা কামনা করেন।
সামুদ্রিক দূষণ রোধে যৌথ উদ্যোগ
সামুদ্রিক দূষণ রোধে সহযোগিতার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন আকিয়ে আবে। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও জাপান একসঙ্গে কাজ করতে পারে। সমুদ্রদূষণের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে তিনি ভবিষ্যতে যৌথ উদ্যোগের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ করার পর মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি টোকিও সফরের পরিকল্পনা করছেন। সেখানে তিনি জাপানের খ্যাতনামা সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথ সামুদ্রিক গবেষণা উদ্যোগে অংশ নেবেন। তাঁর আমন্ত্রণে সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম উপকূলে মহেশখালী–মাতারবাড়ী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা করেছে। এই চুক্তির আওতায় উপকূলীয় এলাকায় তিনটি আদর্শ মৎস্যগ্রাম গড়ে তোলা হবে।
নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। নির্বাচন শেষে তিনি তাঁর আগের কাজে ফিরে যাবেন বলে জানান। ভবিষ্যতে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং ‘থ্রি জিরো’—শূন্য বেকারত্ব, শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ ও শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীকরণ—এই ধারণা বাস্তবায়নেই তিনি কাজ করতে চান।
জাপানি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ
বৈঠকে জাপানের শীর্ষ বায়োফুয়েল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইউগ্লেনার প্রতিষ্ঠাতা মিৎসুরু ইজুমো সামাজিক ব্যবসাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগে সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ সময় এসডিজি সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোরশেদও উপস্থিত ছিলেন।
সার্বিকভাবে, এ বৈঠক বাংলাদেশ–জাপান সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মোঃ খুরশীদ আলম সরকার
দপ্তর সম্পাদক
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পাটি-বিএইচপি।


