ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু ঘিরে দেশজুড়ে যে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও টার্গেটেড হামলার ঘটনা ঘটেছে—তা কেবল ক্ষুব্ধ জনতার আবেগী প্রতিক্রিয়া, নাকি এই অস্থিরতার ভেতর কেউ কেউ কৌশলগতভাবে লাভবান হচ্ছে—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রোমান আইনের প্রাচীন অনুসন্ধানী নীতি Cui Bono—অর্থাৎ কার লাভ হচ্ছে—এই সহিংসতার ঘটনাপ্রবাহে প্রয়োগ করলে একটি জটিল কিন্তু স্পষ্ট ছবি ভেসে ওঠে।
গণআন্দোলনের নৈতিক উচ্চতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
হাদির মৃত্যু প্রথম মুহূর্তে যে নৈতিক সহানুভূতি ও জনসমর্থন তৈরি করেছিল, সহিংসতা সেটিকে দ্রুত প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে—
-
সংবাদমাধ্যম, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ স্থাপনায় হামলা
-
বিদেশি কূটনৈতিক স্থাপনার আশপাশে অস্থিরতা
এই ঘটনাগুলো আন্দোলনের নৈতিক বৈধতাকে দুর্বল করছে।
কার লাভ?
যারা চায় হাদির মৃত্যু-সংক্রান্ত ন্যায্য প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যাক এবং আন্দোলনকে ‘সহিংস’ আখ্যা দিয়ে বাতিল করা হোক।
বিচার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া
হাদি হত্যার প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা ছিল মূল দাবি। কিন্তু সহিংসতার ঢেউ সেই প্রশ্নকে পেছনে ঠেলে দিয়েছে।
বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্র—
-
অগ্নিসংযোগ
-
ভাঙচুর
-
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
কার লাভ?
যারা হাদি হত্যার নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তে আগ্রহী নয়, কিংবা যাদের দিকে তদন্তের তীর ঘুরে যেতে পারে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোরতা বৈধ করার সুযোগ
সহিংসতার ফলে রাষ্ট্রের সামনে তৈরি হয়েছে—
-
অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েনের যুক্তি
-
গণজমায়েত নিয়ন্ত্রণ
-
কড়া আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন,
“সহিংসতা রাষ্ট্রকে সব সময় কঠোর হওয়ার নৈতিক লাইসেন্স দেয়।”
কার লাভ?
যারা চায় রাজনৈতিক স্পেস সংকুচিত হোক, নাগরিক প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রিত হোক।
আন্তর্জাতিক অস্বস্তি তৈরি হওয়া
কূটনৈতিক স্থাপনার আশপাশে হামলা ও বিদেশি স্বার্থসংশ্লিষ্ট এলাকায় উত্তেজনা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
কার লাভ?
-
যারা চায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ুক
-
যারা দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটকে বৈদেশিক ইস্যুতে রূপ দিতে আগ্রহী
‘শ্যাডো অ্যাক্টর’ ও সুযোগসন্ধানীরা
অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, অনেক এলাকায় হামলাকারীরা ছিলেন—
-
সংগঠিত
-
পূর্বপ্রস্তুত
-
নির্দিষ্ট লক্ষ্যনির্ধারিত
বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন “শ্যাডো বেনিফিশিয়ারি”—যারা সরাসরি সামনে না থেকে পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।
কার লাভ?
-
রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা গোষ্ঠী
-
অপরাধী চক্র যারা বিশৃঙ্খলার সুযোগে সক্রিয় হয়
-
মতাদর্শিক চরমপন্থীরা, যারা সংঘাত বাড়াতে চায়
সাধারণ মানুষ—সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত
এই পুরো সহিংসতায় একমাত্র যে পক্ষ কোনোভাবেই লাভবান নয়, তারা হলো সাধারণ মানুষ—
-
ব্যবসা বন্ধ
-
নিরাপত্তাহীনতা
-
আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা
একজন দোকানদার বলেন,
“কারা ক্ষমতায় যাবে জানি না, কিন্তু আগুনে পুড়ছে আমাদের ভবিষ্যৎ।”
শেষ কথা: প্রশ্নটাই আসল
Cui Bono বিশ্লেষণ একটি কথা স্পষ্ট করে—
এই সহিংসতা হাদির স্মৃতি, আদর্শ বা বিচারের দাবিকে শক্তিশালী করেনি; বরং সেটিকে দুর্বল করেছে।
তাই প্রকৃত প্রশ্ন হলো—
-
সহিংসতা কি আন্দোলনের অনিবার্য ফল, নাকি পরিকল্পিত বিচ্যুতি?
-
কারা চায় বিচার নয়, বিশৃঙ্খলা থাকুক?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে, সহিংসতা থামলেও সত্য চাপা পড়ে যাবে।


