শুক্রবার, মে ১, ২০২৬

আমাদের বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর নাকি ১০ জানুয়ারি?

পাঠক প্রিয়

(৩৫ বছর পূর্বে লেখা সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর শিকড় সন্ধানী প্রতিবেদন)
ইতিহাসের একটি নিগুঢ় উদ্দেশ্য হলো শিকড় সন্ধান। সে জন্যই খুব জানতে ইচ্ছে করে ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর আমরা কেমন ছিলাম। ১০ জানুয়ারী ’৭২ কিভাবে দেখা উচিৎ। সেদিন আমাদের নেতারা কে কি করেছেন তা অবশ্যই জানার বিষয়। এ নিয়ে অনুসন্ধিৎসা, গবেষণা এ যাবৎ তেমন হয়নি। গবেষণার গভীরতা এখানে নেই। অনুসন্ধানের ক্ষেত্রও বড় হয়নি। সঙ্কীর্ণ গন্ডির মধ্যে এ সব প্রয়াস সীমাবদ্ধ। আজকের শিরোনাম হচ্ছে, আমাদের বিজয় দিবস কবে? ১৬ ডিসেম্বর না ১০ জানুয়ারী?
অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগবে, এত বছর পর এ নিয়ে বিতর্ক কেন? সবাইতো মেনে নিয়েছে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। আমারও মানতে আপত্তি নেই। মেনে আসছি ২৫ বছর। ইতিহাসের শিকড় সন্ধান করতে গিয়ে আমি কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে, অনেকটা বিভ্রান্তও বলা চলে। নয় মাস আমরা যুদ্ধ করেছি পাক হানাদার বাহিনীর সাথে। এ যুদ্ধ ছিল সর্বগ্রাসী, স্বাধীনতার যুদ্ধ। আপোসহীনভাবে বাঙালি জাতি লড়েছে। হয়েছে অনেক রক্তক্ষয়। জানমালের ক্ষতি হয়েছে প্রচুর। ৩০ লাখ আদম সন্তানের রক্ত ঢেলে দিতে হয়েছে। পাক বাহিনী শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর। মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল, প্রায় এক লাখ পাকিস্তানী আধুনিক সৈন্য। মুজিবনগর সরকারের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন মাত্র। এ নিয়ে বিতর্ক ১৯৭২ সন থেকেই। এখনো এর সুরাহা হয়নি। বরং নতুন নতুন তথ্য বিতর্কের সাথে যোগ হচ্ছে। জেনারেল ওসমানী জীবিত থাকা অবস্থায় বলে যাননি, কেন তিনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসেননি। তৎকালীন সরকারও কোন সময় বলেননি। ফলে বিভ্রান্তি থেকেই গেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন ১৬ ডিসেম্বরকে ইষ্টার্ণ কমান্ড দিবস হিসেবে পালন করে, তখন মনে অস্বচ্ছ অনেক প্রশ্ন দেখা দেয়। আমরা ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস হিসেবে পালন করে আসছি। আমরা মনে করি, এ দিনই হানাদার মুক্ত করে স্বাধীনতার লাল সূর্য্যকে ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। বাস্তব অবস্থাও তাই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আসলেই কি আমরা পুরোপুরি মুক্ত হয়েছিলাম? পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল, এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। ভারতীয়  প্রভাব মুক্ত হয়েছিলাম কিনা, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ ছিল।
ইতিহাস নাড়াচাড়া করতে গিয়ে দেখা যায়, ভারতের সাথে সাত দফা ভিত্তিক যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশকে স্বাধীন ভাবা দুষ্কর হতো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফিরে না এলে, কি হতো বাংলাদেশের স্বরূপ তারই আলোকপাত করছি এই প্রতিবেদনে।
১৯৭১ সনের অক্টোবর। প্রবাসী মুজিবনগর সরকার ও ভারত সরকার একটি সমঝোতায় এলেন। সাতটি বিষয়ে সমঝোতা। এ নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেন, ভারতের একজন কর্মকর্তা ও বাংলাদেশের পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম। চুক্তি স্বাক্ষরের ভয়াবহতা ভেবে এই অনুষ্ঠানেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি এ চুক্তি। মুজিবনগর সরকারের অনেকেই জানতেন না। মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদ।
প্রশাসনিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক বিষয়ই ছিল চুক্তির প্রধান লক্ষ্য। প্রশাসনকে গতিশীল করার জন্য সিদ্ধান্ত হলো, মুক্তিযুদ্ধ করেনি এমন কর্মকর্তাদেরকে চাকুরী থেকে অবসর দেওয়া হবে। অভিজ্ঞ কর্মচারীর শূন্যতা পুরণ করবে, ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের নিজস্ব কোন সেনাবাহিনী থাকবে না। অভ্যন্তরীণ আইন-শৃংখলা রক্ষার জন্য একটি প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠিত হবে। সামরিক সমঝোতার মধ্যে আরো ছিল, বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী অবস্থান করবে। প্রতিবছর নভেম্বর মাসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ হবে। ’৭২ সনের নভেম্বর হতে এর কার্যকারীতা শুরু হবে।
পাকিস্তানের সাথে চুড়ান্ত লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিবেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান। মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক সহ-প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পাবেন না। এ কারণেই জেনারেল ওসমানী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে দর্শকের ভূমিকা পালন করতে রাজী হননি।
বাণিজ্যিক সমঝোতা ছিল, খোলা বাজার প্রতিষ্ঠা। সীমান্তের তিন মাইল জুড়ে চালু হবে খোলা বাজার। কোন নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। শুধু বছর শেষে হিসাব নিকাশ হবে। প্রাপ্য মেটানো হবে পাউন্ড ষ্টালিং এর মাধ্যমে। বিদেশ বিষয়ে ভারত যা বলবে, তাই মেনে চলতে হবে। সাউথ ব্ল¬কের এ্যানেক্স হবে সেগুণ বাগিচা। এক কথায় বলা চলে, উল্লে-খিত চুক্তি বলে, ভারত বাংলাদেশের সামরিক ও পররাষ্ট্র বিষয়ের কর্তৃত্ব পেয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সব কিছু উড়িয়ে দিলেন। বললেন, এই চুক্তি আমি মানি না। একে একে সব সিদ্ধান্ত বাতিল করতে লাগলেন। ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের চলে যেতে বললেন। ভারত তাদের অফিসারদের প্রত্যাহার করে নিল। তিন মাইলের মধ্যে অবাধ বাণিজ্যের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিলেন। রক্ষীবাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত মানলেন। তবে সেনাবাহিনী রাখার পক্ষে মত দিলেন। এ নিয়ে মন্ত্রি পরিষদের এক বৈঠকে তুমুল বিতন্ডা হয়েছিল। এক পক্ষ বললেন, অতীত অভিজ্ঞতার কারণে সেনাবাহিনী রাখার দরকার নেই। বঙ্গবন্ধু মুজিব এ যুক্তি খন্ডন করে বললেন, তোমরা কি বলতে চাও বুঝি না, একটি স্বাধীন দেশে লেফট রাইট শুনব না, তা হয় না। সেনাবাহিনী থাকবে। পাকিস্তান হতে আমি আমাদের অফিসারদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছি। তাজউদ্দীন আহমেদসহ আরো কয়েকজন বিরক্ত হলেন। দিল্লী নাখোশ হলো। ভারতীয় জেনারেলরা প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।
ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মিসেস গান্ধীকে এক বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলেছিলেন কলকাতার গভর্নর হাউসে। মিসেস গান্ধীর সাথে কথা হচ্ছিল নানা বিষয়ে। পাশে ভারতীয় সমরনায়করা উপস্থিত। বঙ্গবন্ধু হঠাৎ বললেন, আমি একটি কথা বলতে চাই।
মিসেস গান্ধী বললেন, বলুন।
আপনি কবে আপনার সৈন্য আমার দেশ থেকে ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আমাকে অনেক কথা শুনতে হচ্ছে এ জন্য।
মিসেস গান্ধী মানেকশ এর দিকে এক পলক তাকিয়ে বললেন, আপনি যেদিন বলবেন সেদিনই।
উল্ল¬সিত বঙ্গবন্ধু মুজিব বললেন, আমিতো চাই যত তাড়াতাড়ি।
মানেকশ বলুনতো, কতদিন সময় লাগবে? মাস তিনেকের মধ্যে সম্ভব ম্যাডাম। ঠিক আছে, তাই হবে।
জেনারেলরা সেদিন সহজে নেননি। ভারতীয় রাজনীতিকরাও ভাবতে পারেননি, মিসেস গান্ধী এত সহজে রাজি হয়ে যাবেন। ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্ঞানী জৈল সিং বলেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা ঠিক হয়নি। মিসেস গান্ধী শেখ সাহেবের অস্বাভাবিক জনপ্রিয়তার কারণে, চটজলদি সম্মতি দিয়েছিলেন। সময় নিলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধু ভারতীয়দের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। ইসলামী সম্মেলন সংস্থার লাহোর শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। ভারত চায়নি বঙ্গবন্ধু মুজিব লাহোর যান। মন্ত্রি পরিষদের বৈঠকে ভিন্ন মতও ছিল। বঙ্গবন্ধু মুজিব বলেছিলেন, আমি লাহোর যাব। ওআইসি’র সদস্যপদ লাভ করব।
বঙ্গবন্ধু মুজিব যেদিন নয় মাস পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ঢাকা এলেন, সেদিন পাকিস্তান থেকে তিনি প্রথম গেলেন লন্ডন। তারপর দিল্লী হয়ে ঢাকা। দিল্লী যখন এলেন, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী খবর পাঠালেন, শেখ সাহেব যেন বৃটিশ এয়ার ফোর্সের বিমানে ঢাকা না যান। অনুরোধ ছিল, তিনি যেন ভারতীয় বিমানে যান। ভারত বলল, বৃটিশ সরকার যেখানে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি, সেখানে শেখ সাহেব কি করে তাদের বিমানে ঢাকা যান। বর্তমান পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ বঙ্গবন্ধুকে ভারতের এই ইচ্ছার কথা যখন জানালেন, তখন তিনি কোন চিন্তা-ভাবনা না করেই বললেন, আমি বৃটিশ বিমানেই যাব। আমার সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত। এতে কোন হেরফের হবে না। মিসেস গান্ধী সেদিন কোন মন্তব্য না করলেও পরে বলেছিলেন, বড্ড জেদী লোক।
১০ জানুয়ারী প্রতি বছর আসে। আওয়ামী লীগ দিবসটি পালন করে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে। জনসভা হয়, বক্তৃতা হয়। কিন্তু একবারও বলা হয় না বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না হলে, কি হতো বাংলাদেশের অবস্থা। আমার মতে ১০ জানুয়ারী হওয়া উচিত আমাদের বিজয় দিবস। কারণ, এ দিনই আমরা সত্যিকার অর্থে মুক্ত হয়েছিলাম। কোন চুক্তি আমাদেরকে আবদ্ধ করে রাখতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু চুক্তি অগ্রাহ্য করে বলেছিলেন, লড়াই করেছি কারো গোলামীর জন্য নয়। কেউ কেউ হয়তো ভাববেন, শেখ মুজিব এমন ছিলেন নাকি? তাঁকে ভারতের দালাল হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু যারা শেখ মুজিবকে জানতেন, চিনতেন, তারাই শুধু বলতে পারবেন। ইতিহাসের দলিল না ঘাটলে আমিও হয়তো সে ধারণা নিয়েই থাকতাম।
২৫ বছরের চুক্তি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। আসলে এ চুক্তিতে তেমন কিছুই নেই। চুক্তি ছিল ১৯৭১ সনের অক্টোবরের। যা কার্যকর হলে, বাংলাদেশ হতো হয়তো আরেক সিকিম রাজ্য। এ চেষ্টাও যে হয়নি, তা বলা যায় না। ১৯৭১ সনের ২৮ ডিসেম্বর তিনজন সংখ্যালঘু নেতা মিসেস গান্ধীর সাথে দেখা করে বাংলাদেশকে ভারতের এ্যানেক্স করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিন জন হলেন, মনরঞ্জণ ধর, প্রয়াত ফনী ভূষণ মজুমদার ও চিত্তরঞ্জণ সুতার। মিসেস গান্ধী এ প্রস্তাবে আমল দেননি।

সর্বশেষ সংবাদ

ময়মনসিংহ ও সিলেটে ৬০ কিমি বেগে ঝড় হতে পারে

অনলাইন ডেস্ক দেশের দুই অঞ্চলে সন্ধ্যার মধ্যে ঝড়ো আবহাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সম্ভাব্য এই দুর্যোগে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০...

ডিএমপিতে পাঁচ পরিদর্শক বদলি

অনলাইন ডেস্ক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পাঁচজন পরিদর্শককে বদলি করা হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (সদরদপ্তর ও প্রশাসন) মো. আমীর খসরুর স্বাক্ষরিত এক আদেশে...

যুদ্ধবিরতির মাঝেই ইরানকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা দিচ্ছে চীন—মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য

অনলাইন ডেস্ক ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই তেহরানকে নতুন করে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন—এমন তথ্য দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। মার্কিন...

হামের প্রাদুর্ভাব: ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত ১৬৯

অনলাইন ডেস্ক দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫...

কাতারে ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড়তে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কাতারসহ বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের জব্দকৃত অর্থ ছাড়তে সম্মত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যদিও...

জনপ্রিয় সংবাদ