
রায়েরবাজার বধ্যভূমি কোনো পর্যটনস্থল নয়, কোনো নান্দনিক স্থাপত্যও নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় অপরাধের স্থায়ী দলিল। বাঁকা দেয়ালের সামনে স্থির জলাধার আসলে আমাদের জমে থাকা লজ্জা, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কালো গ্রানাইট স্তম্ভটি একটি জাতির কাটা গলার নীরব আর্তনাদ। এখানে দাঁড়ালে প্রশ্ন জাগে—একটি জাতি কি কখনো তার কাটা মাথা নিয়ে গর্ব করতে পারে?
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা কোনো ‘যুদ্ধাপরাধের পার্শ্বঘটনা’ নয়; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশকে জন্মের আগেই মেধাশূন্য করে ফেলার ঠান্ডা মাথার রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র। শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, শিল্পী—যাঁরা চিন্তা করতেন, প্রশ্ন তুলতেন, মানুষকে যুক্তির পথে ডাকতেন—তাঁদেরই টার্গেট করা হয়েছিল। কারণ অস্ত্র দিয়ে রাষ্ট্র দখল করা যায়, কিন্তু চিন্তা দখল করা যায় না—এই সত্যটাই তারা ভয় পেত।
চোখ বেঁধে মানুষ তুলে নেওয়া হয়েছিল নিজ ঘর থেকে, সন্তানদের সামনে, স্ত্রীর কান্নার মধ্য দিয়ে। বেয়নেটের খোঁচায় নাড়িভুঁড়ি বের করে দেওয়া হয়েছিল শুধু মানুষ হত্যার জন্য নয়—একটি জাতিকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার জন্য। রায়েরবাজার ও মিরপুরের ডোবা-নালায় পড়ে থাকা নিথর দেহগুলো ছিল আমাদের ভবিষ্যৎ বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, সংবাদকক্ষ ও সাংস্কৃতিক মঞ্চের লাশ।
এটি ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যা নয়—এটি ছিল রাষ্ট্রের বিবেককে শিরশ্ছেদ করা।
সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য হলো, এই হত্যাযজ্ঞ ঘটেছিল বিজয়ের একেবারে দ্বারপ্রান্তে। স্বাধীনতা আসছিল বলেই এই হত্যা। কারণ স্বাধীন রাষ্ট্রে যুক্তিবাদী, মানবিক ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতি স্বাধীনতাবিরোধীদের জন্য ছিল অসহনীয়। তারা জানত—এই মানুষগুলো বেঁচে থাকলে মিথ্যা, সাম্প্রদায়িকতা ও দমনমূলক রাজনীতির জায়গা হবে না।
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টির অবস্থান পরিষ্কার: শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসকে শুধু ফুল দিয়ে, এক মিনিট নীরবতা পালন করে দায় সারা যাবে না। যদি আজও ভিন্নমতকে দেশদ্রোহিতা বলা হয়, যদি আজও লেখক-শিক্ষক-সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া হয়, যদি যুক্তির বদলে গালাগালি আর বলপ্রয়োগকে রাজনীতি বলা হয়—তাহলে বুঝতে হবে, বুদ্ধিজীবী হত্যার রাজনীতি এখনো শেষ হয়নি; কেবল তার পদ্ধতি বদলেছে।
আজ প্রশ্ন তুলতে হবে—আমরা কি আদৌ বুদ্ধিজীবীদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দিতে পেরেছি? আমরা কি তাঁদের দেখানো মানবিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়তে পেরেছি? নাকি আমরা স্মৃতিসৌধ বানিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকছি?
রায়েরবাজারের কালো স্তম্ভ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে অভিযোগপত্র পাঠ করে। সে বলে—যে রাষ্ট্র তার চিন্তাশীল মানুষকে হত্যা করে বা চুপ করিয়ে রাখে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজেই অন্ধ হয়ে যায়। আজ যখন ইতিহাস বিকৃত করা হয়, যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, তখন শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের অসমাপ্ত কাজই এগিয়ে নেওয়া হয়।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা একটিই—ভয়মুক্ত চিন্তা, মুক্ত বাক, মানবিক রাজনীতি ও যুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র নির্মাণ। এর বাইরে সব আনুষ্ঠানিকতা ভণ্ডামি।
১৪ ডিসেম্বর আমাদের শুধু শোকের দিন নয়—এটি আমাদের বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর দিন। প্রশ্ন একটাই: আমরা কি এখনো সেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিণতি বহন করছি, নাকি তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সাহস অর্জন করেছি?
রায়েরবাজার নীরব, কিন্তু তার অভিযোগ শেষ হয়নি।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


