ফরিদ আহমেদ

দেশের অর্থনীতিতে যেন থমকে দাঁড়িয়েছে গতি। বিনিয়োগ নেই, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শ্লথগতি আর সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের কঠোর বাস্তবতা—সব মিলিয়ে রাজস্ব আহরণে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের চাপ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাব সেই সংকটেরই নগ্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঘাটতি শুধু রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা নয়—এটি পুরো অর্থনীতির স্থবিরতার প্রতিচ্ছবি।
রাজস্ব আদায়ের সার্বিক চিত্র: লক্ষ্যের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক
এনবিআরের তথ্য বলছে—
- লক্ষ্যমাত্রা (জুলাই–ডিসেম্বর): ২,৩১,২০৫ কোটি টাকা
- বাস্তব ঘাটতি: ৪৫,৯৮০ কোটি টাকা
ঘাটতির বড় অংশ এসেছে তিনটি প্রধান খাত থেকে:
| খাত | লক্ষ্যমাত্রা (কোটি টাকা) | আদায় (কোটি টাকা) | ঘাটতি (কোটি টাকা) |
|---|---|---|---|
| আয়কর | ৮৫,৪০৫ | ৬১,৮৭৩ | ২৩,৫৩২ |
| আমদানি শুল্ক | ৬৫,০০০ | ৫২,৮৬১ | ১২,১৪০ |
| ভ্যাট | ৮০,৭৯৯ | ৭০,৪৯১ | ১০,৩০৮ |
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে আয়কর খাতে—যা সরকারের রাজস্ব কাঠামোর প্রধান ভরকেন্দ্র।
আয়কর খাত: আয়ের সংকোচনে বড় ধস
ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাবের সরাসরি প্রতিফলন পড়েছে আয়কর খাতে। করপোরেট মুনাফা কমেছে, ব্যক্তি আয়ের গতি থেমেছে, নতুন বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। ফলে—
- অগ্রিম আয়কর কমেছে
- উৎসে করের প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে
- করপোরেট কর আদায় বড় ধাক্কা খেয়েছে
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আয়ের ভিত্তি সংকুচিত হলে কর আদায় বাড়ানো কার্যত অসম্ভব। তাই আয়কর খাতে এই বড় ঘাটতি অর্থনীতির গভীর সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আমদানি ও ভ্যাট: উৎপাদন ও ভোগের ভাটায় রাজস্ব সংকট
আমদানি খাত
সরকারি প্রকল্প স্থবির, বেসরকারি বিনিয়োগ ঝিমিয়ে পড়া—ফলে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ব্যাপকভাবে। এর সঙ্গে কমেছে শুল্ক ও কর আদায়।
ভ্যাট খাত
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় ভোগ ব্যয় সংকুচিত হয়েছে। উৎপাদন থেকে বিপণন—প্রতিটি ধাপে লেনদেন কম হওয়ায় ভ্যাট আদায়ও নেমেছে লক্ষ্যের নিচে।
মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার: দ্বিমুখী চাপে অর্থনীতি
- নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি: ৮.২৯%
- ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি: ৮.৪৯%
বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার নীতি মূল্যস্ফীতি কমাতে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, অথচ বিনিয়োগে তৈরি করেছে নিরুৎসাহ। অর্থনীতি পড়েছে দ্বিমুখী চাপে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি: নিম্নমুখী বাস্তবতা
- সাময়িক হিসাব (২০২৫): ৪ শতাংশের নিচে
- বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস (২০২৫–২৬): সর্বোচ্চ ৪.৮ শতাংশ
এক সময়ের ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির দেশ এখন কার্যত ‘নিম্নগতির অর্থনীতি’র তালিকায় ঢোকার শঙ্কায়।
ব্যবসায়ীদের কণ্ঠ: অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার অর্থনীতি
মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু (বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন):
“আয় না বাড়লে ট্যাক্স আসবে কিভাবে? আইন-শৃঙ্খলা ও নীতির অনিশ্চয়তায় বড় বিনিয়োগ কেউই করবে না।”
শওকত আজিজ রাসেল (আম্বার গ্রুপ, বিটিএমএ সভাপতি):
“নতুন সরকার এলেও রাতারাতি কোনো ম্যাজিক সম্ভব নয়। শিল্পায়ন ছাড়া কর বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো যাবে না।”
ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে স্পষ্ট—রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতা ও করনীতির অস্থিরতা বিনিয়োগকে ঠেকিয়ে রেখেছে।
এনবিআরের বার্তা: জোর নয়, টিকে থাকাই অগ্রাধিকার
এনবিআরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন—
“প্রতিষ্ঠান বাঁচলে রাজস্ব আসবে। এখন চাপ দিয়ে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত করলে রাজস্বের দরজাই বন্ধ হয়ে যাবে।”
অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের কৌশলে এখন রক্ষণশীল অবস্থান—অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখাই প্রথম শর্ত।
রাজস্ব সংকট নয়, এটি অর্থনীতির সতর্কবার্তা
বর্তমান রাজস্ব ঘাটতি নিছক কর ব্যবস্থার সমস্যা নয়—এটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক স্থবিরতার জোরালো সতর্কবার্তা। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন না বাড়লে রাজস্ব ঘাটতি আরও গভীর হবে।
নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে ব্যবসা ও বিনিয়োগে গতি আসতে পারে—তবেই রাজস্ব আহরণ ফিরবে টেকসই পথে। আপাতত দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষার মোড়ে—যেখানে সময়ই বলে দেবে, স্থবিরতা কাটবে নাকি সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
ফরিদ আহমেদ
অর্থ বিষয়ক সম্পাদক
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


