মোঃ খুরশীদ আলম সরকার

কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের প্রধান কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞকে যদি কেবল ‘বিক্ষুব্ধ জনতার ক্ষোভ’ বলা হয়, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হয়—এই হামলা থেকে কারা লাভবান হলো?
কারণ ইতিহাস বলে, স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ সাধারণত স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে; আগুন, লুটপাট ও টার্গেটেড হামলা হয় পরিকল্পনার ফল।
টার্গেট কি কাকতালীয়?
একই রাতে আঘাত আসে তিনটি জায়গায়—
-
প্রথম আলো
-
ডেইলি স্টার
-
ছায়ানট
এই তিনটি প্রতিষ্ঠানই একাধিক সরকারের সময়ে—
-
ক্ষমতার অপব্যবহার,
-
নিরাপত্তা বাহিনীর দায়হীনতা,
-
রাজনৈতিক সহিংসতা
নিয়ে ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও সমালোচনার জন্য পরিচিত।
প্রশ্ন উঠছে, দেশে শত শত গণমাধ্যম থাকতে শুধু এই প্রতিষ্ঠানগুলোই কেন ‘রোষের শিকার’ হলো?
সময় নির্বাচন: দুর্ঘটনা না সুচিন্তিত?
শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মধ্যরাতে হামলা হয়।
এই সময় বেছে নেওয়ার অর্থ কী?
-
আইনশৃঙ্খলা শিথিল
-
প্রশাসনের নজর বিভক্ত
-
আবেগ তুঙ্গে, যুক্তি দুর্বল
এটি কি কেবল কাকতালীয়, নাকি আবেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অন্য একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া?
বার্তাটি কী?
হামলার ধরন লক্ষ্য করলে দেখা যায়—
-
সংবাদকক্ষ
-
আর্কাইভ
-
প্রযুক্তি ও সার্ভার অবকাঠামো
এই স্থানগুলোতেই বেশি ক্ষতি হয়েছে।
অর্থাৎ, উদ্দেশ্য শুধু ভয় দেখানো নয়, তথ্য উৎপাদনের সক্ষমতাকে ধ্বংস করা।
এটি একটি স্পষ্ট বার্তা:
“লিখলে পুড়বে।”
রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি: ব্যর্থতা না নীরব সম্মতি?
কারওয়ান বাজার রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হামলা চলেছে।
প্রশ্ন উঠছে—
-
আগাম গোয়েন্দা সতর্কতা কোথায় ছিল?
-
প্রথম হামলার পর কেন দ্রুত প্রতিরোধ হয়নি?
-
কেন এখনো দৃশ্যমান গ্রেপ্তার নেই?
এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে দুই ধরনের ব্যাখ্যা সম্ভব—
-
চরম অদক্ষতা
-
ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা
উভয় ক্ষেত্রেই ফল এক: গণমাধ্যম অনিরাপদ।
‘মব’ কি সত্যিই অচেনা?
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হামলাকারীদের একটি অংশ ছিল সংগঠিত—
-
একই ধরনের আচরণ
-
নির্দিষ্ট ভবনে আঘাত
-
লুটপাটের পর দ্রুত সরে যাওয়া
এটি সাধারণ ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’র চেয়ে বেশি কিছু নির্দেশ করে।
তবে এখনো প্রশ্ন—এই সংগঠনের নির্দেশদাতা কারা?
রাজনৈতিক সুবিধাভোগীরা কারা?
এই হামলার ফলে—
-
স্বাধীন গণমাধ্যম আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে
-
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন স্থগিত বা বিলম্বিত
-
সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় ও আত্মসংযম
লাভবান হয় কারা?
-
যাদের কর্মকাণ্ড প্রকাশ পেলে অস্বস্তি বাড়ত
-
যাদের জন্য প্রশ্নহীন রাষ্ট্র দরকার
-
যাদের স্বার্থে ভয়ই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র
হাদি হত্যাকাণ্ড: ধোঁয়ার আড়াল?
শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
বরং সেই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দৃষ্টি ঘুরে গেছে গণমাধ্যম ধ্বংসের দিকে।
প্রশ্ন উঠছে—
হাদি হত্যার বিচার কি ইচ্ছাকৃতভাবে আড়ালে চলে যাচ্ছে?
নাগরিক সমাজের সতর্কবার্তা
অধ্যাপক সামিনা লুৎফার ভাষায়,
“এটি বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার একটি জঘন্য প্রচেষ্টা।”
নাগরিক সমাজ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করছে—কারণ নিরাপত্তা ব্যর্থতা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, প্যাটার্নে পরিণত হয়েছে।
শেষ প্রশ্ন
এই হামলার পর যদি—
-
দ্রুত গ্রেপ্তার না হয়
-
নিরপেক্ষ তদন্ত না হয়
-
দায় নির্ধারণ না হয়
তবে একটি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে উঠবে:
এটি কি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, নাকি রাষ্ট্রের ভেতরেরই কারও সফলতা?
কারণ ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে—
যখন গণমাধ্যম পোড়ে, তখন শুধু কাগজ নয়—গণতন্ত্রও ছাই হয়।


