ইব্রাহিম খলিল বাদল

জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতার সুযোগে দেশে মাদক চক্রগুলো আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য দুর্বল হয়ে পড়ায় মাদক সাম্রাজ্যের গডফাদাররা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়।
বর্তমানে নবনির্বাচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক নিয়ন্ত্রণ।
অপ্রচলিত মাদক: নতুন আতঙ্ক
দেশে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি আইস, এলএসডি, ট্যাপেন্টাডল, কুশ ও কেটামিনের মতো অপ্রচলিত মাদক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব নতুন ধরনের মাদক চিহ্নিত করা এবং নিয়ন্ত্রণে আনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সীমান্তজুড়ে মাদকের বিস্তার
তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৯টি সীমান্তবর্তী জেলার ১৬২টি রুট দিয়ে মাদক প্রবেশ করছে। সীমান্তপথে সরবরাহ বাড়ায় মাদকের দামও তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। ফলে সহজেই সেবনকারীদের নাগালে পৌঁছে যাচ্ছে মাদক।
বাংলাদেশে মাদক উৎপাদন না হলেও সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত মাদক প্রবেশ করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান
২০২৪ সালে বিভিন্ন সংস্থার যৌথ অভিযানে জব্দ করা হয়—
-
২ কোটি ২৮ লাখের বেশি ইয়াবা
-
৫০২ কেজি হেরোইন
-
১৩০ কেজি কোকেন
-
প্রায় ২১ কেজি আফিম
-
১ লাখ ১৪ হাজার কেজির বেশি গাঁজা
-
বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল, বিদেশি মদ ও বিয়ার
অন্যদিকে, পরবর্তী বছরের ১১ মাসেই উদ্ধার হয় ৪ কোটির বেশি ইয়াবা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
নতুন মাদক প্রবণতা
গত কয়েক বছরে শুধু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযানে উদ্ধার হয়েছে—
-
আইস: সাড়ে ২১ কেজি
-
এলএসডি: ৩০৭ ইউনিট
-
ট্যাপেন্টাডল: ৬ লাখের বেশি পিস
-
কুশ: ২৩৮ কেজি
-
কেটামিন: ৬ কেজির বেশি
এছাড়া ভারত সীমান্তের কারখানায় তৈরি কোডিনযুক্ত সিরাপ যেমন ফেয়ারডিল, উইন কোরেক্স, ব্রনোকফ সি, চকো প্লাস দেশে ঢুকছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
মাদকবিরোধী অভিযানে কাজ করছে—
-
বাংলাদেশ পুলিশ
-
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ
-
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন
-
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড
-
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর
বিশেষজ্ঞ মত
ড. তৌহিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলেন,
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারগুলো সবসময় জিরো টলারেন্স নীতির কথা বললেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি ছিল। ফলে অনলাইন-অফলাইন দুই মাধ্যমেই মাদক সহজলভ্য হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, কার্যকর সীমান্ত নিরাপত্তা ও বাস্তব জিরো টলারেন্স ছাড়া এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
সংস্থার অবস্থান
মুকুল জ্যোতি চাকমা, উপ-পরিচালক (অপারেশন), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলেন,
মাদক নিয়ন্ত্রণ সব সময়ই কঠিন চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে—
-
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা
-
অনলাইন মাদক বাজার নিয়ন্ত্রণ
-
নতুন মাদক শনাক্তকরণ সক্ষমতা বাড়ানো
-
সমন্বিত গোয়েন্দা তৎপরতা
-
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি
এসব পদক্ষেপ না নিলে মাদক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।


