নিজস্ব প্রতিবেদক

যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাতকড়া এবং পায়ে শিকল পরানো অবস্থায় ফেরত পাঠানো বাংলাদেশিদের ভাষ্য থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের রোমহর্ষক বর্ণনা উঠে এসেছে। গত ৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফেরত পাঠানো হয় মোট ৩১ জন বাংলাদেশিকে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ফেরার পর গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আটকাবস্থায় তাঁদের সঙ্গে “বর্বর ও অমানবিক” আচরণ করা হয়েছে।
৭৫ ঘণ্টা ডান্ডাবেড়ি—বাথরুমেও নিতে দেওয়া হয়নি
ফেরত আসা এক ব্যক্তি—ফয়সাল আহমেদ (ছদ্মনাম)—বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, তিনদিনের বেশি সময় ধরে তাঁকে হাতে হাতকড়া ও কোমরে ডান্ডাবেড়ি পরানো অবস্থায় রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন,
“এখনো আমার হাতে দাগ, কোমরে দাগ। পুরো শরীরে স্পট হয়ে আছে। বাংলাদেশে নামার আগে ৭৫ ঘণ্টা আমাকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হয়েছিল। এমনকি বাথরুমেও যেতে দেয়নি।”
শারীরিকভাবে দীর্ঘসময় শিকলে বাঁধা থাকার কারণে তাঁর শরীরে আঘাতের দাগ এখনও স্পষ্ট বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বৈধতার চেষ্টা ব্যর্থ—আইনি প্রতারণার অভিযোগ
ফয়সালের ভাষ্য, পাঁচ বছর আগে ভিজিট ভিসায় বলিভিয়া গিয়ে তিনি আর দেশে ফেরেননি। সেখান থেকে দালালচক্রের সহায়তায় বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পেরু, ইকুয়েডর ও মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে তিনি পরিচিতজনদের বাসায় থাকতেন এবং সেখানকার আইনি প্রক্রিয়ায় বৈধ হওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
তিনি বলেন,
“বাইডেন প্রশাসনের শুরুর দিকে অনেকেই বৈধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তখন প্রক্রিয়াটা তুলনামূলক সহজ ছিল। আমিও ভেবেছিলাম পারব।”
তিনি জানান,
-
রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন
-
তিন দফায় ওয়ার্ক পারমিট আবেদন
– কোনোটিই সফল হয়নি।
এ ছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে “অ্যাটর্নি” পরিচয়ে কিছু ব্যক্তি বাংলাদেশিদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে প্রতারণা করছে। বৈধতার স্বপ্ন দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি সংগঠিত চক্র সেখানেও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ফ্লাইটে অমানবিক আচরণের বর্ণনা
ফয়সাল আরও জানান, তাঁকে এবং অন্য অনেক বাংলাদেশিকে বিশেষ সামরিক বিমানে তোলা হয় শিকল ও হাতকড়া পরানো অবস্থায়।
তাঁর ভাষায়,
“মনে হচ্ছিল, আমরা অপরাধী নই—তার থেকেও নিচু কিছু। আমাদের সঙ্গে প্রাণীর মতো আচরণ করেছে।”
ফ্লাইটে তাঁদের পর্যাপ্ত পানি বা খাবারও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
আটকাবস্থায় বাংলাদেশিদের সঙ্গে অমানবিক আচরণের খবর সামনে আসার পর মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক আইনে যেকোনো ধরনের নির্বাসন কার্যক্রমে শারীরিক নির্যাতন, অপমান বা অপ্রয়োজনীয় শৃঙ্খল ব্যবহার নিষিদ্ধ।
বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর মেডিকেল চেকআপ ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার দাবি তুলেছেন অনেকে।


