মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬

ব্যাংক খাত ধ্বংস করে নিজের আখের গুছিয়ে বিদায় আহসান মনসুরের

পাঠক প্রিয়

অনলাইন ডেস্ক

দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন—পুঁজিবাজার, ব্যাংকিং খাত ও প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন। কিন্তু তাঁর বিদায়ের প্রাক্কালে প্রশ্ন উঠেছে—এই শুদ্ধি অভিযান কি কাঙ্ক্ষিত ফল দিয়েছে, নাকি অর্থনীতিতে তৈরি করেছে নতুন অনিশ্চয়তা?

শুদ্ধির ঘোষণায় শুরু

২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মোট ১১টি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ ছিল—

  • ক্ষমতার অপব্যবহার

  • হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি

  • বিদেশে অর্থপাচার

তবে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমানভাবে কোনো বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থপাচার বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ে, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বিনিয়োগে সতর্ক হয়ে পড়ে, পুঁজিবাজারে স্থবিরতা দেখা দেয়।

দুবাই ফ্ল্যাট বিতর্ক: অভিযোগ বনাম অস্বীকার

https://live.staticflickr.com/65535/26732824940_ce5c840126_b.jpg
https://dubailand.gov.ae/media/ejuk0dfb/dld-building.jpg
https://d3h330vgpwpjr8.cloudfront.net/x/1504x/Binghatti_Pinnacle_at_Al_Jaddaf_Luxury_Apartments_in_Dubai_e843f4bf59.webp
4নতুন বিতর্কের জন্ম হয় দুবাইয়ের আল জাদ্দাফ এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনা নিয়ে। সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়—২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ১৩.৫ মিলিয়ন দিরহাম (প্রায় ৪৫ কোটি টাকা) মূল্যের একটি ফ্ল্যাট গভর্নর তাঁর মেয়ের নামে কিনেছেন।

এই অভিযোগ সামনে আনেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী সজীব ওয়াজেদ জয়, যিনি একটি ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করেন। সেখানে অর্থপাচারের অভিযোগও তোলা হয়, যদিও কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।

দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের দলিলের তথ্য অনুযায়ী—

  • টাইটেল নম্বর: ৩৪১৪৮০/২০২৪

  • ক্রয়ের তারিখ: ২৪-১২-২০২৪

  • মালিকানা অংশে গভর্নর ও তাঁর মেয়ের নাম উল্লেখ রয়েছে

গভর্নর গণমাধ্যমে দাবি করেন, সম্পত্তিটির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই এবং অভিযোগটি ভিত্তিহীন।

বিদেশ সফর ও প্রশ্ন

দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ১৪ মাসে তিনি ১৪ বার বিদেশ সফর করেন—মোট প্রায় ১০০ দিন বিদেশে অবস্থান। ব্যাংকারদের একাংশের মতে, অতীতে কোনো গভর্নরের এত স্বল্প সময়ে এত দীর্ঘ বিদেশ অবস্থানের নজির নেই। ফলে তাঁর অগ্রাধিকার ও প্রশাসনিক মনোযোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

কড়াকড়ি মুদ্রানীতি ও অর্থনীতির চাপ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যুক্তিতে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। ফলে ব্যাংকঋণের সুদ ১৬ শতাংশের ঘরে পৌঁছায়।

এর প্রভাব:

  • শিল্প ও ব্যবসা খাতে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি

  • বিনিয়োগ স্থবিরতা

  • উৎপাদন খাতে চাপ

  • প্রত্যাশিত হারে মূল্যস্ফীতি না কমা

সমালোচকদের ভাষ্য—দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও কড়াকড়ি নীতি মিলিয়ে অর্থনীতিতে তৈরি হয় ‘নীতিগত অনিশ্চয়তা’।

বিএফআইইউ তথ্য ফাঁসের অভিযোগ

বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)–এর ফ্রিজকৃত ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত স্পর্শকাতর তথ্য গভর্নর অফিসে সংরক্ষণ ও তা একটি সিন্ডিকেটের কাছে পাচারের অভিযোগও ওঠে।

অভিযোগে বলা হয়—

  • ফ্রিজ থাকা হিসাব সচল করার নামে তদবির

  • সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ আদায়

  • মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কাঠামো লঙ্ঘনের সম্ভাবনা

যদিও এসব অভিযোগের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ হয়নি।

বিলাসবহুল গাড়ি কেনা নিয়ে বিতর্ক

সরকারি ‘৮ বছরের ক্রয়সীমা’ ও ব্যয় সংকোচননীতি উপেক্ষা করে প্রায় দুই কোটি টাকার একটি বিলাসবহুল এমপিভি কেনার অভিযোগও উঠেছে। দাবি করা হয়েছে—

  • যথাযথ দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ হয়নি

  • সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজকে উপেক্ষা করা হয়েছে

  • গাড়িটি অনুমোদিত স্ট্যান্ডার্ড তালিকায় নেই

তবে এ বিষয়ে গভর্নর বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ব্যাংক খাতে সংস্কার নাকি অস্থিরতা?

ড. মনসুরের আমলে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়—

  • একাধিক ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণ

  • খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উন্মোচন

  • ২% ডাউনপেমেন্টে পুনঃতফসিল সুবিধা

  • ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন

  • যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন

সমর্থকদের মতে, এগুলো ছিল কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা। সমালোচকদের মতে, দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ অর্থনীতিকে অস্থির করেছে।

শেষ প্রশ্ন: যুদ্ধের ফল কোথায়?

দুর্নীতির বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ উচ্চারণ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বিদায়ের মুহূর্তে ড. আহসান এইচ মনসুরকে ঘিরে রয়েছে—

  • অমীমাংসিত তদন্ত

  • সম্পদ বিতর্ক

  • নীতিগত বিতর্ক

  • প্রশাসনিক অভিযোগ

অর্থনীতির শুদ্ধি অভিযানের এই অধ্যায় শেষ হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—
এই যুদ্ধ কি অর্থনীতিকে সুস্থ করেছে, নাকি অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায় লিখেছে?

দেশের আর্থিক খাত এখন তাকিয়ে আছে পরবর্তী নেতৃত্বের দিকে—সংস্কারের ধারাবাহিকতা থাকবে, নাকি শুরু হবে নতুন পথচলা?

সর্বশেষ সংবাদ

‘সার্ভিস’ শব্দের বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু কী মানুষের মুক্তি ঘটেছে?

সুফি সাগর সামস্ ভাষা, ক্ষমতা ও মানবমর্যাদা নিয়ে একটি পুনর্বিবেচনা সভ্যতার ইতিহাসে শব্দ কখনো কেবল শব্দ নয়; তারা একটি যুগের সামাজিক...

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ, জরুরি সংবাদ সম্মেলন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, শুক্রবার: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন জাতীয় সংসদের...

মানবমস্তিষ্ক: মহাবিশ্বের ভেতর আরেক মহাবিশ্ব

সুফি সাগর সামস্ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি কি কোনো নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা কৃষ্ণগহ্বর? হয়তো নয়। হয়তো সবচেয়ে বিস্ময়কর কাঠামো হলো মানবমস্তিষ্ক—কারণ এই ক্ষুদ্র জৈবিক অঙ্গই সমগ্র মহাবিশ্বকে...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে গেলে স্বাধীনতার মূল্যবোধও হারাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা না গেলে একসময় স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধও হারিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ...

এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না : ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশৃঙ্খল করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে...

জনপ্রিয় সংবাদ