মোঃ খুরশীদ আলম সরকার

রাজধানী ঢাকায় এখন শ্বাস নেওয়াই যেন একটি সংগ্রাম। ধোঁয়া, ধুলো আর বিষাক্ত কণায় ভরে আছে নগরীর বাতাস। ধূমপান না করেও শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন নগরবাসী—বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা। গত এক মাসে একদিনের জন্যও ঢাকাবাসী বিশুদ্ধ বাতাস পায়নি।
বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা আইকিউএয়ার–এর তথ্যমতে, গত ১৯ নভেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ৩০ দিনের মধ্যে ২৪ দিন ঢাকার বাতাস ছিল ‘অস্বাস্থ্যকর’ এবং ছয় দিন ছিল ‘অতিমাত্রায় অস্বাস্থ্যকর’। এই সময়ে বাতাসে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম ২.৫-এর মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ১২ থেকে ৩২ গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল।
ধুলোর নগরী, অসুস্থ ভবিষ্যৎ
শীত মৌসুম এলেই ঢাকার আকাশ ধুলায় ধূসর হয়ে ওঠে। দিনের বেশির ভাগ সময় সূর্যের আলো ঢেকে যায় ধোঁয়া আর ধুলোর চাদরে। ঘরের আসবাবপত্রে জমছে ধুলোর আস্তর। বাড়ছে সর্দি, কাশি, হাঁপানি ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ।
খিলক্ষেত এলাকার বাসিন্দা চার বছর বয়সী ফারিয়া তাবাসসুম এখনই শ্বাসকষ্টের রোগী। তার মা রওশন আরা বেগম বলেন,
“ধুলার মধ্যে গেলেই বাচ্চাটা অসুস্থ হয়ে পড়ে। সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সুস্থ হতে ১০–১৫ দিন লেগে যায়। শীতকালের পুরো সময়টাতেই কম-বেশি অসুস্থ থাকে।”
ডাক্তারদের পরামর্শে বাইরে গেলে শিশুটিকে বাধ্যতামূলক মাস্ক পরাতে হয়। বয়স অনুযায়ী ওজন থাকার কথা ২১ কেজি, অথচ দূষণজনিত অসুস্থতায় তার ওজন নেমে এসেছে প্রায় ১৪ কেজিতে।
বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা
বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ‘ব্রেথ অব চেঞ্জ: সলিউশনস ফর ক্লিনার এয়ার ইন দ্য ইন্দো-গাঙ্গেটিক প্লেইন্স অ্যান্ড হিমালয়ান ফুথিলস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার ভয়াবহ বায়ুদূষণ পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—
-
ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি ও হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চলের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ বর্তমানে অসহনীয় মাত্রার দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে
-
প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছে
-
দূষণজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি এ অঞ্চলের বার্ষিক জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ
দূষণের মূল উৎস কোথায়
বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটান নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলে বায়ুদূষণের প্রধান পাঁচটি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে—
-
রান্নায় লাকড়ি ও কয়লার ব্যবহার
-
ফিল্টারহীন শিল্পকারখানা
-
পুরোনো ও দূষণকারী যানবাহন
-
ফসলের খড় পোড়ানো
-
অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
রাস্তায় রাস্তায় ধুলোর রাজত্ব
রাজধানীতে উবার ও পাঠাওয়ের মাধ্যমে রাইড শেয়ার করা ইসমাইল বলেন,
“৩০ মিনিট বাইক চালালেই হাত-মুখ কালো হয়ে যায়। কাপড় নোংরা হয়ে যায়। মাস্ক পরলেও কাজ হয় না। সকালে কাশি দিলে মনে হয় কফের সঙ্গে কালি বের হচ্ছে।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর প্রায় সব সড়কের পাশের গাছের পাতাও ধুলোয় ধূসর। বিভিন্ন রাস্তায় নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা হচ্ছে। কাজ শেষ হলেও বালু পুরোপুরি সরানো হচ্ছে না। নিয়ম না থাকলেও উন্মুক্ত ট্রাকে বালু পরিবহন করা হচ্ছে, চলার সময় যা বাতাসে উড়ে চারপাশকে ঢেকে দিচ্ছে। কোথাও নিয়মিত পানি ছিটিয়ে ধুলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।
প্রশ্ন উঠছে নিয়ন্ত্রণে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণ এখন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়—এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি। অথচ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর তদারকি, নিয়মিত সড়ক পরিষ্কার, নির্মাণকাজে শৃঙ্খলা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় কঠোরতা—সবই যেন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
বিশুদ্ধ বাতাস এখন ঢাকাবাসীর কাছে বিলাসিতা। প্রশ্ন থেকে যায়—এই নগরীতে শ্বাস নেওয়ার মৌলিক অধিকার কবে ফিরবে?


