
বাংলাদেশের মাটিতে যারা গণতন্ত্রের কথা বলে, জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা করে, সব ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতির মানুষকে সমান মর্যাদায় রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়—তাদের অবস্থান মহানবী হযরত মুহম্মদ (স) প্রবর্তিত সংবিধান “মদিনা সনদ” এর রাজনীতির সঙ্গে শতভাগ সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মত ইসলামপন্থী দলগুলো ইসলামের নামে প্রতারণা করে উমাইয়া খিলাফতের একচ্ছত্রবাদী রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে চায়। তারা আসলে নবী মুহম্মদ (স) প্রবর্তিত রাজনীতির অনুসারী নয়, তারা উমাইয়া খিলাফতের সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী রাজনীতির অনুসারী।
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী মুহম্মদ (স) মদিনার সব ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মানুষকে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দিয়ে গণভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি সংখ্যালঘু কিংবা ভিন্নমতের কাউকে বাদ দেননি। ইয়াহুদি, খ্রিস্টান, পৌত্তলিক, এমনকি মুশরিকরাও মদিনা রাষ্ট্রে মর্যাদার সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করত। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এই ইসলামী ঐতিহ্যকে পদদলিত করে উমাইয়া রাজনীতির অনুসারী হয়েছে—যেখানে ক্ষমতা কেবল বংশ বা গোষ্ঠীর হাতে বন্দি থাকে, আর ভিন্নমত দমনই খিলাফতীয় রাজনীতির মূলনীতি।
জামায়াত কেন মহানবী মুহম্মদ (স) প্রবর্তিত সংবিধান মদিনা সনদের বিরুদ্ধে উমাইয়া খিলাফতের রাজনীতি আঁকড়ে ধরে আছে? জামায়াত উমাইয়া খিলাফতের রাজনীতি আঁকড়ে ধরে আছে এজন্য যে, মহানবীর ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে, মহানবীর দাফন না করেই মহানবীর ঘনিষ্ঠ, কুরাইশ বংশের এক সাহাবির নেতৃত্বে খিলাফতের সূচনা হয়েছিল। সব ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, এমনকি দাস-দাসীদের সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নাগরিত্বের সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারসম্পন্ন মহানবীর উদারচিন্তার রাজনৈতিক মতবাদ ওই সাহাবির পছন্দ ছিল না, এটা জামায়াতে ইসলামীসহ বাংলাদেশের কোনো ইসলামি দল কল্পনাও করতে পারেনি।
কুরাইশরা ছিল আরবের নেতৃত্বশালী সবচেয়ে শক্তিশালী বংশ। তাদের দাস-দাসী এবং অন্যান্য ছোট জাতের মানুষদের তারা সামাজিকভাবে তাদের সমকক্ষ মর্যাদার নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা মহানবীর ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে নবীর শাসনতন্ত্রের বিপরীতে খিলাফতের শাসনতন্ত্র কায়েম করেন। কারণ, মহানবীর বহুত্ববাদের রাজনীতিতে ক্ষমতা সকল শ্রেণিপেশার জনগণের হাতে চলে যায়। খিলাফতের রাজনীতিতে বিশ্বাসী জামায়াত সেটা চায় না, তারা জনগণের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চায়।
জনগণের ভোটে জামায়াত কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারবে না—তাই তারা মহানবী মুহম্মদ (স) প্রবর্তিত সংবিধান মদিনা সনদের রাজনৈতিক মতবাদকে মানব রচিত কুরআনবিরোধী রাজনৈতিক মতবাদ বলে অপপ্রচারের করে জনগণকে ধোঁকা দিচ্ছে। উমাইয়া খিলাফতের মত তারাও ইসলামকে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন তারা জনগণের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের দোসর হয়েছিল, আজও তেমনি জনগণের অধিকারবিরোধী রাজনীতিতে লিপ্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিসহ গণতান্ত্রিক শক্তি বহুত্ববাদী রাজনীতি করে—যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই সমানভাবে দেশের নাগরিক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্রের চর্চা মহানবী হযরত মুহম্মদ (স) প্রবর্তিত সংবিধান মদিনা সনদের বহুত্ববাদী রাজনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু জামায়াত রসুল (স) প্রবর্তিত বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে ধ্বংস করে দিতে চায়, একচ্ছত্রবাদী উমাইয়া রাজনীতির অন্ধকার কবরে টেনে নিতে চায় আধুনিক বাংলাদেশকে।
জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামি চাদরে মোড়ানো রাজনৈতিক দল ও তাদের মত উমাইয়া খিলাফত সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো আসলে মহানবী মুহম্মদ (স) প্রবর্তিত সংবিধান মদিনা সনদের বিরোধিতা করে। তারা ইসলামের নাম ভাঙিয়ে বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধোঁকা দিতে চায়। এরা হযরত মুহম্মদ (স) প্রবর্তিত সংবিধান মদিনা সনদের শত্রু, এরা ইসলামের বিশ্বাসঘাতক।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হযরত মুহম্মদ (স) প্রবর্তিত বহুত্ববাদী গণতন্ত্রেই নিরাপদ—যেখানে সব ধর্ম-বর্ণ-সংস্কৃতির মানুষ সমমর্যাদায় থাকবে। জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকে জঙ্গিবাদী উমাইয়া খিলাফতের রাজনীতি পরিত্যাগ করে মহানবী হযরত মুহম্মদ (স) প্রবর্তিত উদারচিন্তার গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে আসতে হবে। অন্যথায়, মহানবী মুহম্মদ (স) এর উম্মদ বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদেরকে প্রতিরোধ করবে। বাংলাদেশের মানুষ বাংলার মাটিতে উমাইয়া খিলাফতের নামে ইয়াজিদের রাজত্ব কায়েম হতে দেবে না।
সুফি সাগর সামস্, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


