অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশে ডিজিটাল অবকাঠামো বিস্তারের পরও দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখনো ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপে উঠে এসেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪৮.৯ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। এর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। বিপরীতে, প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষ কার্যত ডিজিটাল সংযোগহীন অবস্থায় রয়েছেন। ফলে তারা সরকারি ডিজিটাল সেবা, তথ্যপ্রাপ্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রতি তিন মাস পরপর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রয়োগ ও ব্যবহার নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে বিবিএস। সর্বশেষ এই জরিপটি করা হয়েছে চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে। এ সময় দেশের ৬১ হাজার ৬৩২টি খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে পাঁচ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গত এক দশকে সরকার ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক বিস্তারে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, এই অবকাঠামোর সুফল এখনো সাধারণ মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, দেশে ৮১ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও নিজের নামে মোবাইল সেটের মালিকানা রয়েছে মাত্র ৫৭ শতাংশ মানুষের। অর্থাৎ প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ অন্যের ফোনের ওপর নির্ভরশীল। এতে ব্যক্তিগতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি পরিবারে এক বা দুটি স্মার্টফোন থাকলেও ব্যবহারকারী একাধিক হওয়ায় ইন্টারনেট ব্যবহারে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্ক নাগরিকরা এই সীমাবদ্ধতার শিকার হচ্ছেন বেশি।
ইন্টারনেট ব্যবহারে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যও স্পষ্ট। জরিপ অনুযায়ী, পুরুষদের মধ্যে ৫১ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও নারীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৪৬ শতাংশের কিছু বেশি। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, এই ব্যবধান শুধু পরিসংখ্যানগত নয়; বরং এটি নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে একটি বড় বাধা।
গ্রামাঞ্চল ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর অবস্থাও উদ্বেগজনক। মোবাইল ডেটার উচ্চমূল্য, স্মার্টফোনের সীমিত প্রাপ্যতা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব তাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ছিল ৩৮.৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮.৯ শতাংশে। তিন বছরে প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্ট অগ্রগতি হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অগ্রগতি অসম ও বৈষম্যপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের অভিমত, টেকসই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হলে ইন্টারনেটের দাম কমানো, স্মার্টফোন সহজলভ্য করা এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।


