
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট আজ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা-প্রবণ মৌসুম মিলিয়ে একটি ভয়াবহ পানিসংকটের মুখোমুখি লক্ষ লক্ষ মানুষ। বহু এলাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে খাল, পুকুর কিংবা অস্বাস্থ্যকর উন্মুক্ত উৎসের পানি পান করছে। এতে জলবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে বহু গুণ। বিশেষ করে আসন্ন শুকনো মৌসুমে এই সংকট আরও তীব্র হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে সোলার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্রযুক্তিভিত্তিক পাইলটিং প্রকল্প। চায়নার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি)-এর সহায়তায় এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)-এর তত্ত্বাবধানে উপকূলীয় অঞ্চলে শুরু হয়েছে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন।
লবণাক্ততা–উপকূলের মানুষের দীর্ঘদিনের অভিশাপ
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষ বহু বছর ধরে পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সাগরের লবণাক্ত পানি উজানে ঢুকে পড়া এবং ভূগর্ভস্থ মিষ্টি পানির স্তর নেমে যাওয়ায় এলাকাগুলোতে টিউবওয়েল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। ফলে মানুষের নির্ভরতা পড়ে পুকুর-খালের ওপর—যা স্বাস্থ্যগত দিকে বিপজ্জনক।
সমাধানে সোলার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট
ডিপিএইচই জানিয়েছে, পাইলট পর্যায়ে উপকূলীয় কয়েকটি উপজেলার দুর্গম গ্রামগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটে থাকবে—
-
সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন
-
আধুনিক রিভার্স অসমোসিস (RO) বা মেমব্রেন ফিল্ট্রেশন প্রযুক্তি
-
দিনে গড়ে ৫–১০ হাজার লিটার বিশুদ্ধ পানি উৎপাদনের সক্ষমতা
-
স্থানীয় জনগণের জন্য সহজ রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা
সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই প্রযুক্তি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল এলাকাগুলোর জন্য আদর্শ সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চায়না সিসিইসিসি–র সহায়তা: দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে যুক্ত। এবার তারা প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে উপকূলে টেকসই পানিসমাধান তৈরির উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সফল হলে এই মডেল বড় পরিসরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নাগরিকদের প্রত্যাশা ও সামনে সম্ভাবনা
স্থানীয় মানুষদের প্রত্যাশা—এই প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে চালু থাকলে উপকূলের নারীরা আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে গিয়ে পানি আনতে বাধ্য হবে না। শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ কমবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইলট প্রকল্প সফল হলে উপকূলীয় ১৫–২০টি জেলায় বৃহত্তর পরিকল্পনায় সোলার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা যেতে পারে। এতে পানিসংকটের পাশাপাশি লবণাক্ততার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিও মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
উপকূলের মানুষের পানির সংকট শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; এটি স্বাস্থ্য, জীবিকা ও মানবিক অধিকারের সঙ্গে জড়িত একটি বহুমাত্রিক সংকট। সোলার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্প সেই সংকট উত্তরণে একটি কার্যকর ও টেকসই দিক নির্দেশনা দিতে পারে। সফল বাস্তবায়ন হলে এই প্রযুক্তিই বদলে দিতে পারে উপকূলীয় বাংলাদেশের পানির ভবিষ্যৎ।


