বিশেষ প্রতিবেদক

খোলা জায়গা নেই, ভবন ঠাসাঠাসি—ঝুঁকির তালিকায় ১৫টি এলাকা
বাংলাদেশের ভূমিকম্প–ঝুঁকির মানচিত্রে দীর্ঘদিন ধরেই ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শহর’ হিসেবে চিহ্নিত ঢাকা। ভূ-প্রাকৃতিক কারণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতি, ভবন নির্মাণের নৈরাজ্য এবং খোলা জায়গার ঘাটতি—সব মিলিয়ে রাজধানী এখন এক ভয়াবহ বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রিখটার স্কেলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলেও ঢাকার ভবনগুলো চেইন-রিঅ্যাকশনের মতো ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে।
সুউচ্চ ভবন ও কংক্রিটের জঙ্গল
ঢাকায় গত এক দশকে উচ্চ ভবনের সংখ্যা বাড়লেও নির্মাণশৈলীর নিরাপত্তা যাচাই, মাটির ধরন, নির্মাণবিধি মানা—এসব জায়গায় অব্যবস্থাপনা চোখে পড়ার মতো। অধিকাংশ জায়গায় ভবনগুলো গা ঘেঁষে নির্মিত। ফলে এক ভবন ধসে পড়লে পার্শ্ববর্তী একাধিক ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জনঘনত্ব পৃথিবীর সর্বোচ্চগুলোর একটি হলেও খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খুবই সীমিত। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্পে নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।
উদ্ধার অভিযান চলবে বাধার মুখে
ভূমিকম্প–পরবর্তী ‘গোল্ডেন আওয়ারে’ উদ্ধারকাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঢাকার সরু রাস্তা, এলোমেলো বৈদ্যুতিক তার, যানজট, সংযুক্ত ভবন এবং দুর্বল অবকাঠামো উদ্ধারকাজকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আধুনিক সরঞ্জাম বাড়ানো হলেও বর্তমান সক্ষমতা অনুযায়ী বড় ধরনের দুর্যোগে হাজারো মানুষ আটকে পড়লে তা সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে আসছেন।
ঢাকার ১৫টি এলাকা ‘ভয়ংকর ঝুঁকিতে’
বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ঢাকার মাটি, ভবনঘনত্ব, অবকাঠামো ও পুরোনো স্থাপনা বিবেচনায় অন্তত ১৫টি এলাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত। সেগুলো হলো—
-
পুরান ঢাকা (চকবাজার, লালবাগ, ইসলামপুর, সূত্রাপুর)
-
নয়ারহাট–বংশাল এলাকা
-
আজিমপুর–লালবাগ সংলগ্ন অঞ্চল
-
কথাবাজার–শ্যামবাজার এলাকা
-
মগবাজার–ইস্কাটন
-
মালিবাগ–হাজারিবাগ এলাকা
-
কেল্লার মোড়া–নারিন্দা অঞ্চল
-
খিলগাঁও–তিলপাপাড়া
-
মিরপুরের কিছু অংশ (মিরপুর-১, ২, ১০ আশপাশ)
-
কাওরান বাজার–ফার্মগেট–তেজগাঁও সন্নিহিত এলাকা
এই এলাকাগুলোর বেশির ভাগেই ভবনের ঘনত্ব অনেক বেশি, রাস্তা সংকীর্ণ এবং অধিকাংশ ভবন পুরোনো বা অনিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্মিত।
ভূমিকম্পের সম্ভাব্য পরিণতির ভয়াবহ চিত্র
ঢাকার নিচে গঠিত দুর্বল অলুভিয়াল মাটি ও ভরাট জমি ‘শেকিং’ বা কাঁপুনিকে বাড়িয়ে দেয়। রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকায় কয়েক লাখ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ হতাহত হওয়ার বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাসলাইন বিস্ফোরণ, ভবনধস, আগুন এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
প্রতিরোধ–প্রস্তুতি: এখনই জরুরি
-
ভবন নির্মাণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ
-
পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করে সংস্কার বা ভেঙে পুনর্নির্মাণ
-
প্রতিটি ওয়ার্ডে খোলা মাঠ বা ‘ইমার্জেন্সি অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট’ ঘোষণা
-
উদ্ধারকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জাম বৃদ্ধি
-
ভূমিকম্প প্রস্তুতি নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মহড়া
-
ভূমিকম্প-সহনশীল নগর পরিকল্পনা গ্রহণ
শেষ কথা
ঢাকা নগরী যে ভয়াবহ ভূমিকম্প–ঝুঁকিতে আছে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে আশঙ্কা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো সুপরিকল্পিত নগরায়ণ, সচেতনতা এবং ঝুঁকি–প্রস্তুতির বাস্তবায়ন। সময় যতই পেরিয়ে যাচ্ছে, ঝুঁকি ততই বাড়ছে—এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।


