নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

ব্যাংকের তহবিলে অর্থের ঘাটতি না থাকলেও ডেটা স্থানান্তরের জটিলতায় আপাতত আমানতকারীরা হাতে টাকা পাচ্ছেন না—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা জমা হলেও একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক তথ্য এখনো একক ডেটাবেইসে পুরোপুরি স্থানান্তর না হওয়ায় অর্থ ছাড় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেটা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে কোন গ্রাহক কত টাকা পাবেন—তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় তাড়াহুড়া করে টাকা ছাড় করলে ভবিষ্যতে আইনি ও হিসাবগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ূব মিয়া জানিয়েছেন, ডেটা ট্রান্সফারের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই এ প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে সাধারণ আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে।
চেয়ারম্যান বলেন, আইন বিভাগ ও আইটি বিভাগ একসঙ্গে কাজ করছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আইনি বা হিসাবগত জটিলতা না তৈরি হয়। পাশাপাশি ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে যোগ্য এমডি খোঁজার কাজ চলছে। শিগগিরই এই নিয়োগ সম্পন্ন হবে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ব্যাংকটি পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
ডেটা স্থানান্তরের পাশাপাশি ব্যাংকিং কাঠামো পুনর্গঠনের কাজও চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে থাকা পুরনো অ্যাকাউন্টগুলো বাতিল করে একীভূত ব্যাংকের নামে নতুন করে একাধিক কারেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে—যেমন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এক্সিম, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ইউনিয়ন ইত্যাদি। তবে আমানতকারীদের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, নতুন করে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন নেই এবং তাঁরা আগের চেক ব্যবহার করেই টাকা তুলতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আমানতকারীদের টাকা পরিশোধে মোট ব্যয় হবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং আমানত বীমা তহবিল থেকে দেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ধরা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। সরকারের অংশের ২০ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যেই ছাড় করা হয়েছে, বাকি অর্থ ধাপে ধাপে মূলধনে যুক্ত হবে।
ব্যাংকটির ভিত্তি শক্ত করতে নেওয়া উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—শীর্ষ পর্যায়ে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সৎ কর্মকর্তাদের নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের পরিচালন নীতিমালা প্রণয়ন এবং গ্রাহক আস্থা পুনর্গঠন। রাজধানীর মতিঝিলের সেনা কল্যাণ ভবনে ইতোমধ্যে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় চালু হয়েছে। সরকার চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদও নিয়োগ দিয়েছে, যেখানে সাবেক ও বর্তমান আমলারা রয়েছেন। ভবিষ্যতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে পর্ষদ আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ডেটা স্থানান্তরের কাজ শেষ হলেই আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন। পুরনো সব গ্রাহককেই নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আইটি ও এইচআর কাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলমান রয়েছে এবং প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইটি টিম সহায়তা দেবে।
নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা না করার বিষয়ে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট দিন ঘোষণা করলে একসঙ্গে সব শাখায় অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হতে পারে, যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সে কারণে ধাপে ধাপে টাকা ফেরতের কৌশল নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যাদের সত্যিই প্রয়োজন, তাঁরা টাকা তুলবেন—তবে অপ্রয়োজনে অন্য ব্যাংকে সরানোর উদ্দেশ্যে টাকা তুলে নিলে নতুন ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নষ্ট হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট জমা এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে এসব ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য হবে আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
সরকারি মালিকানায় ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু হওয়াকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ূব মিয়া বলেন,
“আমাদের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার হলো আমানতকারীদের টাকা নিরাপদ রাখা এবং তাঁদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। ডেটা স্থানান্তরের কাজ শেষ হলেই সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে—এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
সূত্র: কালের কণ্ঠ


