ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

ভারত বলছে, এটি “রুটিন কূটনৈতিক যোগাযোগ”। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যারা বাস্তবতা বোঝেন, তারা জানেন—কূটনীতিতে কিছুই রুটিন নয়, বিশেষ করে যখন তা হয় বিতর্কিত ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ভারতীয় কূটনীতিকদের সাক্ষাৎ এবং পরে নয়াদিল্লির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আসলে ভারতের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশেরই নগ্ন প্রকাশ।
প্রশ্ন হলো—ভারত কেন এখন জামায়াতের সঙ্গে কথা বলছে?
ভারতের পুরোনো কৌশলের ভাঙন
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ভারতের নীতি ছিল স্পষ্ট—ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, বিরোধী বা বিতর্কিত শক্তিকে উপেক্ষা। কিন্তু সেই কৌশল এখন আর কার্যকর থাকছে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠ অনিশ্চিত, ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণ ঝুলে আছে নানা সংস্কার, নির্বাচন ও গণভোটের ওপর। এই বাস্তবতায় ভারত বুঝে গেছে—একটি ঘোড়ার ওপর বাজি ধরার সময় শেষ।
জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ সেই কৌশল বদলেরই প্রমাণ। এটি কোনো আদর্শিক সমর্থন নয়, বরং এক ধরনের আগাম রাজনৈতিক বিনিয়োগ—যাতে ভবিষ্যৎ যেকোনো পরিস্থিতিতেই নয়াদিল্লি অপ্রস্তুত না থাকে।
‘সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ’—এই ভাষার রাজনীতি
রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্যে বলা হয়েছে, ভারত বাংলাদেশে “সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ” রাখে। এই বাক্যটি আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ হলেও, এর ভেতরে রয়েছে শক্ত বার্তা—ভারত এখন কাউকে একচেটিয়া অংশীদার হিসেবে দেখছে না। এটি একদিকে ক্ষমতাসীনদের জন্য সতর্কবার্তা, অন্যদিকে বিরোধী শক্তিগুলোর জন্য ইঙ্গিত—ভারতের দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়।
এই অবস্থান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ ও প্রশ্ন তৈরি করাই স্বাভাবিক।
জামায়াত কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে
জামায়াতে ইসলামীর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা আজ নয়, কাল—এমন দাবি হয়তো কেউ করবে না। কিন্তু দলটি এখনো একটি সংগঠিত সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তি। ভারত জানে, রাজনীতিতে শক্তির গুরুত্ব শুধু সংসদের আসনে নয়, রাজপথ, সমাজ ও আদর্শিক প্রভাবেও মাপা হয়। সেই হিসাবেই জামায়াতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করার ঝুঁকি নিতে চায় না নয়াদিল্লি।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে কূটনীতিকদের নাম গোপন রাখার অনুরোধের বিষয়টি সাক্ষাৎটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। এটি স্পষ্ট করে—এই যোগাযোগ নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না।
বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর বাস্তবতা
এই ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আনে—দেশের রাজনীতি এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলো একাধিক বিকল্প প্রস্তুত রাখছে। এটি কোনো একটি দলের প্রতি অনাস্থা নয়; বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার প্রতিফলন।
ভারত আজ জামায়াতের সঙ্গে কথা বলছে, কাল অন্য কারও সঙ্গে। বার্তাটি পরিষ্কার—নয়াদিল্লি সম্পর্ক নয়, পরিস্থিতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
ভারতের এই যোগাযোগকে ‘রুটিন কূটনীতি’ বলে হালকাভাবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে ভারতের বাস্তববাদী, ঠান্ডা মাথার হিসাব। আর এই হিসাবের সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত হলো—বাংলাদেশের রাজনৈতিক আস্থা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে ভারত আর নিশ্চিত নয়।
এটাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু সবচেয়ে সত্যিকারের বার্তা।


