
রাজনীতি হলো, রাজার নীতি। রাজার নীতিই রাজনীতি। কিন্তু দেশ এবং দেশের প্রজাদের চেয়ে রাজা বড় নয়। তবে রাজার পরিবার অনেক বড়। সমগ্র দেশ এবং দেশের সকল প্রজাদের নিয়েই রাজার পরিবার। দেশের সকল প্রজাই রাজার সন্তান। রাজার তিনটি বিশেষ কর্তব্য রয়েছে। এক. দেশ এবং দেশের প্রজাদের প্রতি ন্যায় বিচার করা। দুই. দেশ এবং দেশের প্রজাদের রক্ষা করা। তিন. যোগ্য উত্তরসুরি নিয়োগ করা। যোগ্য উত্তরসুরি যদি নিজ সন্তানদের মধ্যে না থাকে, তবে প্রজাদের মধ্য থেকে যোগ্য উত্তরসুরি বেছে নিয়ে তাঁকে নিয়োগ করতে হবে। কারণ, প্রজারা তো রাজারই সন্তান। রাজা শুধু রাজাই, ব্যক্তি নন। এজন্য রাজার ব্যক্তিগত কোনো কর্ম নেই। রাজার জীবন জনগণের জন্য উৎসর্গকৃত হয়। রাজার মাথায় থাকে ন্যায়-নীতির কঠিন বিধান। রাজা মায়া-মমতায় অন্ধ হতে পারেন না। যোগ্য উত্তরসুরি নিযোগ করা না হলে দেশ ও জাতির প্রতি অন্যায় করা হয়।
রাজা ন্যায়-নীতির কঠিন পারাকাষ্ঠ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন। প্রজাদেরকে নিজ সন্তানের ন্যায় প্রতিপালন করেন। এ ধরনের রাজার নীতির সাথে প্রজাদের নীতির ফারাক থাকে না। মহান আল্লাহর নির্দেশে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে হযরত মুহম্মদ (স) গণভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে রাজনীতি এখন আর রাজার নীতি নয়, রাজনীতি হয়েছে জননেতার নীতি। কিন্তু রাজা বা জননেতা নীতিপতি নয়, প্রতিনিধি। নীতিপতি হলেন, মহান আল্লাহ। প্রাকৃতিক এই ভূমন্ডল কোনো জননেতা, রাজা-মহারাজা বা কোনো খলিফার নয়, মহান আল্লাহর। মজ্জাগতভাবে আল্লাহ প্রদত্ত ন্যায়-নীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, বিবেক-বিবেচনা থেকেই মানুষ ন্যায়-নীতি, আইন বা বিধি-বিধান প্রণয়ন করেন। তাই জননেতা নীতিপতির প্রতিনিধি, নীতিপতি নয়। ন্যায়-নীতি হলো, জননেতা বা রাজার ধর্ম।
একইভাবে জনগণ তো রাষ্ট্রপ্রধানেরই সন্তান। রাষ্ট্রপ্রধান শুধু রাষ্ট্রপ্রধানই, ব্যক্তি নন। এজন্য রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কোনো কর্ম নেই। তাঁদের জীবন জনগণের জন্য উৎসর্গকৃত হয়। রাষ্ট্রপ্রধানের মাথায় থাকে ন্যায়-নীতির কঠিন বিধান। রাষ্ট্রপ্রধান মায়া-মমতায় অন্ধ হতে পারেন না। রাষ্ট্রপ্রধান ন্যায়-নীতির কঠিন পারাকাষ্ঠ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন। রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী তাঁদের আত্মীয়-স্বজন, দল কিংবা দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রতি অন্ধ হতে পারেন না। আত্মীয়তা কিংবা দলীয় মায়া-মমতায় অন্ধ হয়ে অন্য দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রতি বিমাতাসুলব আচরণ করতে পারেন না। অথবা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য অন্য দলের প্রতি দমন-পীড়ন নীতি গ্রহণ করতে পারেন না। কোনো কারণে অন্য দলের প্রতি হিংসা-প্রতিহিংসায় প্রজ্জ্বলিত হতে পারেন না। রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর জন্য এসব কর্ম শোভনীয় কিংবা নীতিসঙ্গত নয়।
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগকারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃতি আকাশের মতো উদার হয়। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত আকর্ষণীয়, সৃজনশীল এবং সংবেদনশীল হয়। তাঁদের কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জনগণের আমানত হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজেদের প্রভাব-বৈভব বা প্রতিপত্তি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন না। যে-কোনো অবস্থায় কোনো বিচ্যুতি ঘটলে তখনই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিত্যাগ করার মানসিকতা তাঁদের থাকে। নিজেদেরকে আইনের শাসনের অধীনস্থ করে আত্মঅহংকারের সকল পথ রুদ্ধ করে রাখেন। তাঁরা পারস্পরিক সহযোগীতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চা করেন। পরমতসহিষ্ণুতা তাঁদের রাজনৈতিক ভূষণ। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু বৈরিতার কোনো স্থান নেই। রাজনীতির প্রতিটি স্তরে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর রুচিশীলতা ও পরিশীলিত মানসিকতার প্রতিফলন হলো, নিখুঁত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবয়ব। প্রতিপক্ষ বন্ধু থাকে, কিন্তু শত্রু বা শত্রুতা থাকে না। গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভাষা হলো, শালীন এবং শোভন। গণমানুষ শান্তিপূর্ণ সমাজগঠন এবং তা সংরক্ষণ করে থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), তরীকত ফেডারেশন, জাকের পার্টি, ইসলামী শাসনতান্ত্রিক আন্দোলন, বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি ইত্যাদি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও এসব দলের অঙ্গসংগঠন এবং দলসমূহের আদর্শ, উদ্দেশ্য, নেতাকর্মী, সমর্থক, অর্থ-সম্পদ, শক্তি ইত্যাদি যা কিছু আছে, তা সবই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ। রাজনৈতিক দলসমূহ বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য অহর্নিশি কাজ করে। বাংলাদেশের উন্নয়ন, বাংলাদেশের সম্মান, মর্যাদা, অর্থ-সম্পদ, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি সবই জনগণের। বাংলাদেশের জনগণ এবং বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন একটি সত্ত্বা বা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
একইভাবে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক কোনো নাগরিক থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সবাই এক ও অভিন্ন একটি জীবন ও রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা। সকলেই একই পবিত্র সংবিধানের অধীন। কোনো নাগরিক কোনো নাগরিকের শত্রু হতে পারেন না। সকলেই সকলের বন্ধু ও অতি আপনজন। প্রকৃতিগত বাঙলা নামক একই মাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। সকলেই সকলের ভালো-মন্দ, সুখ-দু:খ, হাসি-আনন্দ, স্নেহ, মমতা, জীবন ও মরণের সাথী।
সুতরাং কোনো দল যদি কোনো কারণে কিংবা কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয় কিংবা শিকার হয়ে অজ্ঞতাবশত কোনো ভুল পথে অগ্রসর হয়, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, ওই দল কিংবা ওই দলের নেতাকর্মী এবং সমর্থকদের ভুল ভাঙ্গিয়ে দেয়া। ওই দল কিংবা দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দমন-পীড়ন করা নয়। রাষ্ট্রের কুটনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিপদগামী ওই দলের নেতাকর্মী এবং সমর্থকদের ওই বিপদ থেকে উদ্ধার করা এবং জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা। অন্যথা হলে, গণ-জাগরণ, গণ-অভ্যুত্থান এবং গণ-বিপ্লব অবধারিত। এই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে। এই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জুলাই যোদ্ধারা ফেসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটিয়েছিল।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


