ইব্রাহিম খলিল বাদল

রাজধানী ঢাকায় তীব্র গ্যাসসংকট এখন কেবল রান্নাঘরের সমস্যা নয়—এটি হয়ে উঠেছে নগর জীবনের সার্বিক সংকট। আবাসিক গ্রাহকদের চাহিদার অর্ধেকও গ্যাস না পাওয়ায় রান্না থেকে শুরু করে যানবাহন চলাচল, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসা—সবখানেই তৈরি হয়েছে ভোগান্তি ও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে মানুষ ঝুঁকছেন রাইস কুকার, বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা মাটির চুলার দিকে। ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে বৈদ্যুতিক বিল ও জ্বালানি খরচ, অন্যদিকে বাড়ছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়।
রান্নাঘরে গ্যাস নেই, বাড়ছে বিদ্যুৎ বিল
গত কয়েকদিন ধরে তিতাস গ্যাসের আবাসিক গ্রাহকরা কার্যত গ্যাসবিহীন জীবনযাপন করছেন। অনেক বাসায় চুলা জ্বালানো যাচ্ছে না দিনের পর দিন। অথচ মাস শেষে নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
মিরপুর শ্যাওড়াপাড়ার বাসিন্দা শফিকুর রহমান বলেন,
“আমার বাসায় গ্যাসের সংকট বহুদিনের। এবার শীতে পরিস্থিতি এত খারাপ যে চুলা জ্বালানোই যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে রাইস কুকার ও বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি। এতে একদিকে যন্ত্রপাতির খরচ, অন্যদিকে বিদ্যুতের বিল—দুটোই বাড়ছে। অথচ গ্যাস বিল তো দিচ্ছিই।”
নিউ মার্কেট ও বায়তুল মোকাররম এলাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বিক্রেতারা জানান, গত দুই সপ্তাহে রাইস কুকার ও বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক দোকানে ক্রেতার ভিড় লেগেই থাকছে। বিক্রেতাদের হিসাবে, বৈদ্যুতিক চুলায় নিয়মিত রান্না করলে মাসে অতিরিক্ত ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল বাড়তে পারে।
স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা মাটির চুলা
বিদ্যুৎনির্ভর বিকল্প সবার পক্ষে সম্ভব নয়। স্বল্প আয়ের অনেক পরিবার আবার ফিরে যাচ্ছে মাটির চুলা ও লাকড়ির ব্যবহারে। এতে রান্নার খরচ কিছুটা কম হলেও পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হোটেল-রেস্টুরেন্টে আগুন নিভে যাচ্ছে, বাড়ছে খাবারের দাম
বাসায় রান্না করতে না পেরে অনেক মানুষ নির্ভর করছেন হোটেল-রেস্টুরেন্টের ওপর। কিন্তু সেখানেও গ্যাসসংকটের প্রভাব পড়েছে। এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে অনেক রেস্টুরেন্ট স্বাভাবিকভাবে খাবার প্রস্তুত করতে পারছে না।
মিরপুর পল্লবীর এক খাবারের দোকানের কর্মচারী রহিশ শেখ বলেন,
“বাজারে সিলিন্ডার নাই। যা পাওয়া যায়, তার দাম অনেক বেশি। এই কারণে খাবারের দাম বাড়ানো হইছে।”
এই পরিস্থিতিতে কিছু অসাধু রেস্টুরেন্ট মালিক সুযোগ নিয়ে খাবারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্যাসসংকট পরিস্থিতি নিয়ে আজ বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের কথা রয়েছে।
অটোগ্যাস ও সিএনজি সংকটে যানবাহনে বাড়তি ব্যয়
গ্যাসসংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। অটোগ্যাস ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনারস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় সব অটোগ্যাস স্টেশন কার্যত বন্ধের পথে।
সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মো. হাসিন পারভেজ বলেন,
“গত দুই দিনে এলপিজি সংকট আরও ভয়াবহ হয়েছে। রাজধানীর অর্ধেকের বেশি অটোগ্যাস স্টেশনে গ্যাস নেই। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও সরবরাহ খুব কম। ফলে গাড়ির মালিকরা বাধ্য হয়ে পেট্রোল ও অকটেনের মতো ব্যয়বহুল জ্বালানিতে চলে যাচ্ছেন।”
এর ফলে যানবাহন পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত যাত্রী ভাড়ার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংকটের চক্রে নগরজীবন
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসসংকট এখন একটি চক্রাকার সমস্যায় রূপ নিয়েছে। গ্যাস না থাকায় বিদ্যুতের ওপর চাপ বাড়ছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারে বাড়ছে বিল। আবার রান্না ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বাড়ছে খাবার ও সেবার দাম। সব মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ছেন মধ্য ও নিম্ন আয়ের নগরবাসী।
গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই সংকট আরও গভীর হবে—এমন আশঙ্কাই এখন ঢাকাবাসীর।
ইব্রাহিম খলিল বাদল
সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


