অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রতীক, বিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি ইন্তিকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ, দৃঢ় ও আপসহীন সংগ্রামের অধ্যায় শেষ হলো।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন এমন এক নেত্রী, যাকে দল-মত নির্বিশেষে দেশের মানুষ ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে সম্মান ও ভালোবাসায় স্মরণ করে। গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করেননি—এই দৃঢ় অবস্থানই তাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
রাজনীতিতে পদচারণা ও নেতৃত্বে উত্থান
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন খালেদা জিয়া। তখন দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন। সে সময় বিএনপি ছিল নেতৃত্ব সংকটে বিপর্যস্ত। দলের হাল ধরবেন কে—এ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা।
এর ছয় মাস পর, ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যোগ দেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতায় তিনি দলের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন।
১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন এবং একই বছরের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর থেকেই দলকে সংগঠিত করা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন তিনি।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও আপসহীনতার পরিচয়
স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে রাজপথে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি বারবার নিপীড়নের শিকার হন, কারাবরণ করেন; কিন্তু অবস্থান থেকে একচুলও সরে যাননি।
রাষ্ট্রক্ষমতা ও বিরোধী রাজনীতিতে সংগ্রাম
বেগম খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্ষমতায় থেকেও যেমন, বিরোধী দলে থেকেও তেমনি তিনি ছিলেন দৃঢ় ও স্পষ্টভাষী। ওয়ান ইলেভেনের সময় তাকে দেশ ছাড়তে চাপ দেওয়া হলেও তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। দেশের মাটি ছেড়ে না গিয়ে তিনি প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন—যা তার রাজনৈতিক সাহসিকতার বড় উদাহরণ।
গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে তিনি একের পর এক মামলা, কারাবরণ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন। টানা সাত বছর বন্দিদশায় থেকেও তিনি কোনো আপস করেননি। অসুস্থতা ও নানা চাপের মধ্যেও তার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল অনড়।
দলের নেতৃত্বে দীর্ঘ পথচলা
বিএনপির নেতৃত্বে থেকেও তিনি একাধিকবার দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছেন।
১৯৯৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর দলের চতুর্থ কাউন্সিলে দ্বিতীয়বার,
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তৃতীয়বার এবং
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দশম কাউন্সিলে চতুর্থবারের মতো তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
প্রতিবারই তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা ও আন্দোলনের পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যদিও পথটি ছিল কণ্টকাকীর্ণ।
হার না মানা সংগ্রামের নাম
বেগম খালেদা জিয়ার পুরো রাজনৈতিক জীবন ছিল আপসহীনতা, দৃঢ়তা ও সংগ্রামের প্রতীক। ক্ষমতা হোক বা কারাবাস—কোনো অবস্থাতেই তিনি নিজের বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি। সে কারণেই তিনি শুধু একটি দলের নেত্রী নন; দেশের রাজনীতিতে তিনি হয়ে উঠেছেন হার না মানা সংগ্রামের এক শক্তিশালী নাম।
তার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে তিনি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন একজন দৃঢ়চেতা, আপসহীন ও সংগ্রামী নেত্রী হিসেবে।


