অনলাইন ডেস্ক

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০–১৯৩২) ছিলেন উপমহাদেশের নারী জাগরণের পথিকৃৎ, স্বপ্নদ্রষ্টা ও কণ্ঠস্বর। তাঁর জন্মদিনে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় জীবনে রোকেয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যর্থতার বিষয়ে তীব্র আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে নারীশিক্ষা, নারী অধিকার ও সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতির কাঙ্ক্ষিত মাত্রা অর্জনে ধীরগতি, এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টিতে সমাজের ব্যর্থতা।
১০০ বছরে আরেকজন রোকেয়া সৃষ্টি করতে পারিনি
ড. ইউনূস বলেন,
-
রোকেয়া তাঁর সময়ের চেয়েও বহু দূরের স্বপ্ন দেখেছেন।
-
তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল “সাংঘাতিকভাবে বিপ্লবী” ও প্রগতিশীল।
-
কিন্তু এত দীর্ঘ সময় পরেও দেশের নারী নেতৃত্ব, চিন্তাশক্তি ও সামাজিক আবহে তাঁর মত আরেকজন পথিকৃৎ উঠে আসেনি—এটাই জাতির দুর্ভাগ্য।
স্বপ্নগুলোকে আমরা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিইনি
তিনি বলেন,
-
রোকেয়ার নির্দেশনা, শিক্ষাদর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমরা কথা বলেছি, শ্রদ্ধা জানিয়েছি—কিন্তু বাস্তবে অগ্রসর হইনি।
-
নারী শিক্ষায় অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু রোকেয়ার ভাবনার মতো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।
-
স্বপ্ন বাস্তবায়নে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগের অভাব ছিল।
ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে আহ্বান
ইউনূস জানান,
-
রোকেয়া দিবস শুধু স্মরণ নয়, আত্মসমালোচনারও দিন।
-
কেন দেশের সামাজিক কাঠামো নতুন রোকেয়া সৃষ্টি করতে পারেনি—এটা বিশ্লেষণ জরুরি।
-
রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার কোথায় ব্যর্থ—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে।
রোকেয়ার যুগ বনাম আজকের বাংলাদেশ
-
রোকেয়ার সময় ছিল নারীশিক্ষার প্রায় শূন্যতা, পর্দা প্রথার কঠোরতা, বদ্ধ সমাজব্যবস্থা।
-
তিনি একাই শিক্ষা, সাহিত্য, সংগঠন—সব মাধ্যমে লড়াই চালিয়েছেন।
-
আজ অগ্রগতি থাকলেও তাঁর চিন্তার গভীরতা, সাহসিকতা ও মৌলিক ধারণার মতো নেতৃত্ব কম দেখা যায়।
নারীর অর্থনৈতিক অবস্থান
-
নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বেড়েছে (বিশেষত পোশাক খাতে),
কিন্তু উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি এখনও সীমিত। -
উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি-ক্ষেত্রে নারীরা এখনো পিছিয়ে।
-
গ্রামীণ নারী উন্নয়নে ইউনূসের প্রচেষ্টার পরও সামাজিক রূপান্তর ধীর।
শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা
-
নারীর সাক্ষরতা বাড়লেও গবেষণা, বিজ্ঞান, দর্শন, প্রযুক্তি, নীতি-নির্ধারণ—এই ক্ষেত্রগুলিতে নারীর নেতৃত্ব কম।
-
সৃষ্টিশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরণে কাঠামোগত বাধা রয়ে গেছে।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো
-
সামাজিক রীতি-নীতি, পারিবারিক চাপে নারীর স্বপ্ন প্রায়ই সীমিত থাকে।
-
রোকেয়ার সময়ের মতো আজও সমাজে “নিরাপদ সীমা” আরোপের প্রবণতা বিদ্যমান।
রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার দুর্বলতা
-
নারী উন্নয়ন নীতি থাকলেও বাস্তবায়ন ধীর, ক্ষেত্রভেদে অসম।
-
উদ্ভাবন ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব গঠনের ধারাবাহিক কর্মসূচি নেই।
জাতির আত্মসমালোচনা করার আহ্বান
প্রথমবারের মতো সরকারি সর্বোচ্চ পরিষদের প্রধান এভাবে “নতুন রোকেয়া না হওয়া” বিষয়টিকে জাতির ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিলেন।
নারী উন্নয়ন নীতিতে ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ
এ বক্তব্য নারী উন্নয়ন, নেতৃত্ব বিকাশ, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং সমাজ সংস্কার বিষয়ে সরকারি নীতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
রোকেয়ার আদর্শকে বর্তমান বাস্তবতায় অভিযোজিত করার তাগিদ
ইউনূস ইঙ্গিত দেন—রোকেয়ার ধারণাগুলোকে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নতুন দিশা দিতে হবে।
আগামীর করণীয়
১. নারী নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি
-
বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র, স্টার্টআপ ও নীতিনির্ধারণে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য বিশেষ স্কিম।
২. রোকেয়া রিসার্চ সেন্টার
-
রোকেয়ার চিন্তা, নারী অধিকার, প্রযুক্তি ও সামাজিক সংস্কার নিয়ে গবেষণার জন্য সরকারি অনুদান।
-
বিদ্যালয় পর্যায়ে রোকেয়া-চেতনা শিক্ষা
-
পাঠ্যপুস্তকে রোকেয়ার জীবন ও চিন্তার ওপর ব্যবহারিক পাঠ, নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ।
-
-
বৈষম্য হ্রাসে আইনি সংস্কার
-
নারীর সম্পদ অধিকার, নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য রোধে কঠোর বাস্তবায়ন।
-
-
গ্রামীণ নারীর উদ্ভাবনী কর্মসূচি
-
প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার।
-
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য শুধু আবেগঘন আক্ষেপ নয়; এটি জাতিকে আত্মসমালোচনা ও নতুন দিশা খুঁজে নেওয়ার আহ্বান। ১০০ বছর আগে রোকেয়া যে পথ দেখিয়েছিলেন, তা এখনও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক, কারণ আমরা এখনো “তার মতো একজনের” প্রয়োজন উপলব্ধি করি।
নতুন রোকেয়া সৃষ্টি হবে তখনই, যখন রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার যৌথভাবে নারীর স্বাধীনতা, শিক্ষা, সৃষ্টিশীলতা ও সাহসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।


