
১৭৫৭ সালের পালাশীর যুদ্ধ ইতিহাসের এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়। অনেকের ধারণা, লর্ড ক্লাইভের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সেনাদের কাছে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। কিন্তু আসল সত্য ভিন্ন। সিরাজউদ্দৌলারা কখনো পরাজিত হন না; পরাজিত হয় তাদের স্বজাতি, তাদের দেশের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতায়।
যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য এবং লর্ড ক্লাইভের ডায়েরি
লর্ড রবার্ট ক্লাইভ লিখেছিলেন—
“আমাদের সৈন্যরা যখন সিরাজউদ্দৌলাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল, তারা যদি প্রত্যেকে এক একটি করে ঢিল ছুঁড়ে মারতো, তাহলে আমাদের সৈন্যরা নাস্তানাবুদ হয়ে যেত।”
ডায়েরির এই লাইন শুধু একটি সামরিক জয়কে চিত্রিত করে না। বরং তা তুলে ধরে সেই আত্মসমর্পণের মুহূর্ত, যখন বাহিরি শক্তি নয়, স্বজাতির বিশ্বাসঘাতকতা যুদ্ধের ভাগ্য পরিবর্তন করেছিল।
স্বজাতির হাতেই পরাজয়
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, নবাব সিরাজউদ্দৌলা কখনোই ইংরেজ সেনাদের সামরিক শক্তির কাছে হেরে যাননি। তার প্রকৃত পরাজয় হয়েছিল নিজেরই সেনাপতি ও রাজনৈতিক সহযোগীদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। মীর জাফরসহ কয়েকজন কৌশলগত নেতার পিছুটান ও দ্বিচারিতা ছিল সেই দিন বাংলাদেশের স্বাধীন শাসনব্যবস্থার বিপর্যয়ের মূল কারণ।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, পালাশীর যুদ্ধ একটি রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার নাটক, যেখানে বিদেশি শক্তি শুধু সুযোগ নিয়েছিল। তাই বলা হয়—“সিরাজউদ্দৌলারা কখনো পরাজিত হয় না; পরাজিত হয় স্বজাতির মানুষ।”
নবাবের আদর্শ ও ইতিহাসের শিক্ষা
সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শাসক, যিনি দুর্নীতি দমন, বিদেশি বাণিজ্য কোম্পানির শোষণ বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে অটল ছিলেন। কিন্তু স্বার্থান্বেষী অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীর কারণে তার স্বপ্ন শেষ হলো অচিরেই।
ইতিহাস তাই মিথ্যা বলে না। এটি মনে করিয়ে দেয়—বিদেশি শত্রু যত শক্তিশালী হোক না কেন, দেশের মানুষের স্বার্থ ও বিশ্বাসঘাতকতার হাতেই একটি রাষ্ট্র ভেঙে যেতে পারে।
আজকের প্রেক্ষাপট
সিরাজউদ্দৌলার কাহিনী শুধুমাত্র ইতিহাস নয়, এটি জাতির জন্য সতর্কবার্তা। আত্মসমর্পণ নয়; সতর্কতা, ঐক্য ও সৎ নেতৃত্বই পারে একটি জাতিকে মুক্ত এবং শক্তিশালী রাখতে।
পালাশীর দিনটি তাই শুধু যুদ্ধের দিন নয়; এটি আমাদের জাতীয় চেতনার মূল্যায়নের দিন। ইতিহাসের চোখে, সিরাজউদ্দৌলা কখনো পরাজিত হননি—পরাজিত হয়েছিল স্বজাতির বিশ্বাসঘাতকতায়।
সুফি সাগর সামস
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


