সুফি সাগর সামস্

ভাষা, ক্ষমতা ও মানবমর্যাদা নিয়ে একটি পুনর্বিবেচনা
সভ্যতার ইতিহাসে শব্দ কখনো কেবল শব্দ নয়; তারা একটি যুগের সামাজিক কাঠামো, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং মানবচেতনারও প্রতিচ্ছবি। একটি শব্দের ব্যুৎপত্তি আমাদের অতীতের দরজা খুলে দেয়, আর তার বর্তমান ব্যবহার আমাদের বলে দেয়—একটি সভ্যতা কতদূর এগিয়েছে।
ইংরেজি ‘Service’ (সার্ভিস) শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন servitium থেকে, যার অর্থ ‘দাসত্ব’, ‘পরাধীনতা’ কিংবা ‘দাস হিসেবে থাকার অবস্থা’। এই servitium আবার এসেছে servus থেকে, যার অর্থ ‘দাস’। পরবর্তীকালে শব্দটি পুরাতন ফরাসি ও মধ্য ইংরেজি হয়ে আধুনিক ইংরেজিতে প্রবেশ করে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর অর্থ বিস্তৃত হয়ে দাঁড়ায়—সহায়তা, জনসেবা, পেশাগত দায়িত্ব, সামরিক সেবা, ধর্মীয় উপাসনা, গ্রাহকসেবা এবং রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রতীক হিসেবে।
এটি ভাষাবিজ্ঞানের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ব্যুৎপত্তি কোনো শব্দের ঐতিহাসিক উৎস ব্যাখ্যা করে; বর্তমান অর্থ নির্ধারণ করে তার সামাজিক ব্যবহার। সেই অর্থে আধুনিক ইংরেজিতে ‘Service’ শব্দটি আর দাসত্বের সমার্থক নয়; বরং এটি দায়িত্ব, দক্ষতা, সহযোগিতা এবং জনকল্যাণের ধারণাকে ধারণ করে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
ভাষা পরিবর্তিত হলেও সমাজের ক্ষমতার কাঠামো সবসময় সমান গতিতে পরিবর্তিত হয় না। ইতিহাসের বহু শব্দ তাদের অভিধানগত অর্থ বদলালেও সামাজিক মনস্তত্ত্বে অতীতের ছাপ বহন করে চলে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—
আমরা কি সত্যিই সেবার সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছি, নাকি কেবল দাসত্বের ভাষাকে আরও পরিশীলিত রূপ দিয়েছি?
বিশ্বের অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ আইনগতভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে তারা কঠোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করেন। যেখানে মর্যাদার পরিবর্তে আনুগত্য, সংলাপের পরিবর্তে নির্দেশ, অংশীদারিত্বের পরিবর্তে একতরফা নিয়ন্ত্রণ এবং সৃজনশীলতার পরিবর্তে নিঃশর্ত অনুগমনকে অধিক মূল্য দেওয়া হয়।
এটি আইনগত অর্থে দাসত্ব নয়—এ কথা নিঃসন্দেহে সত্য। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, মানসিক, সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা কি সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?
যখন কোনো কর্মপরিবেশে মানুষ নিজের বিবেক, সৃজনশীলতা কিংবা মর্যাদার চেয়ে পদমর্যাদার ভয়কে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়, তখন সেখানে স্বাধীনতার আইনগত ঘোষণা থাকলেও স্বাধীনতার মানসিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতাকে অনেকে ‘মানসিক দাসত্ব’, ‘প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্যের সংস্কৃতি’ কিংবা ‘ক্ষমতানির্ভর কর্মসংস্কৃতি’ বলে অভিহিত করেন।
আমার দৃষ্টিতে, মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শব্দ পরিবর্তন নয়; মানসিকতার রূপান্তর।
যে রাষ্ট্রে সরকারি কর্মকর্তা নিজেকে জনগণের মালিক মনে করেন, যে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগকর্তা কর্মীকে কেবল নির্দেশ পালনের যন্ত্র হিসেবে দেখেন, কিংবা যে সমাজে মর্যাদার পরিবর্তে ক্ষমতা সম্পর্কের ভিত্তিতে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয়—সেখানে ‘সার্ভিস’ শব্দটি যত আধুনিকই হোক, তার অন্তর্নিহিত মানবিক দর্শন পূর্ণতা লাভ করে না।
একবিংশ শতাব্দীর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও মানবাধিকারভিত্তিক সমাজে ‘সার্ভিস’ শব্দের নতুন সংজ্ঞা হওয়া উচিত—
সেবা মানে আনুগত্য নয়; দায়িত্ব।
সেবা মানে অধীনতা নয়; অংশীদারিত্ব।
সেবা মানে ক্ষমতার প্রদর্শন নয়; জবাবদিহিতা।
সেবা মানে কর্তৃত্ব নয়; মানবমর্যাদার প্রতি অঙ্গীকার।
জনসেবক জনগণের প্রভু নন; জনগণের অর্পিত দায়িত্বের রক্ষক। নিয়োগকর্তা কর্মীর মালিক নন; তিনি একটি যৌথ লক্ষ্য অর্জনের নেতৃত্বদানকারী। আর কর্মী কোনো প্রজা নন; তিনি মানবমর্যাদা, অধিকার ও সৃজনশীলতার পূর্ণ অধিকারসম্পন্ন একজন অংশীদার।
ভাষার ইতিহাস আমাদের অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়; কিন্তু সভ্যতার ইতিহাস নির্ধারিত হয় আমরা ভবিষ্যৎকে কীভাবে নির্মাণ করি তার ওপর।
অতএব, আজ প্রয়োজন কেবল শব্দের পরিবর্তন নয়; প্রয়োজন কর্মসংস্কৃতি, প্রশাসনিক দর্শন এবং ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তির পুনর্গঠন। এমন এক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ‘সার্ভিস’ শব্দটি আর কখনো দাসত্বের ইতিহাসের স্মারক হবে না; বরং স্বাধীন মানুষে মানুষের প্রতি দায়িত্ব, সহযোগিতা, মর্যাদা এবং মানবতার সর্বজনীন অঙ্গীকারের প্রতীক হয়ে উঠবে।
যেদিন সেবা হবে মর্যাদার, নেতৃত্ব হবে জবাবদিহিতার, আর কর্মসম্পর্ক হবে অংশীদারিত্বের—সেদিনই মানবসভ্যতা শব্দের নয়, চেতনারও প্রকৃত বিবর্তন সম্পন্ন করবে।
সুফি সাগর সামস্
বিশ্ব-সার্বভৌম সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তনের প্রবক্তা
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


