ইব্রাহিম খলিল বাদল

দাবির মাধ্যম হয়ে উঠেছে সড়ক অবরোধ
১৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বৃহস্পতিবারের শেষ কর্মদিবসটি ঢাকার মানুষের জন্য ছিল বিভীষিকাময়। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সাতটি কলেজের শিক্ষার্থীরা মিরপুর সড়ক ও আশপাশের সড়ক অবরোধ করেন। এর ফলে হাজারো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়েন, কেউ কেউ হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছান।
-
আন্দোলনে অংশ নেওয়া কলেজগুলো: ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ।
-
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলাফল: রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত।
-
পরবর্তী কর্মসূচি: রবিবারের মধ্যে সরকার ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ জারি না করলে সোমবার আবারও অবরোধ হবে।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ঢাকা শহরে ১,১৩০টি সড়ক অবরোধ হয়েছে, যার অন্তত ৬০% শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আন্দোলনের কারণে। সড়ক অবরোধের সবচেয়ে বেশি ঘটনা হয়েছে শাহবাগে, যেখানে গত ১৭ মাসে অন্তত ৩৫০ দিন রাস্তা বন্ধ ছিল।
শিক্ষাঙ্গনের বিশৃঙ্খলা
চলতি বছরের জুলাই আন্দোলনের পর শিক্ষাঙ্গন শান্ত হয়নি। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কারণে রাজপথে অবস্থান করছে:
-
পরীক্ষা বাতিল, অটোপাস, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের দাবি।
-
আন্দোলনের প্রভাব: শিক্ষকের উপর চাপ, কিছু শিক্ষার্থী স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় সহিংসতা চালাচ্ছে।
-
প্রভাবিত শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: উপাচার্য, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষকসহ সাধারণ শিক্ষকরা পদত্যাগ বা আক্রমণের শিকার। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু শিক্ষকরাও আক্রান্ত হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয় ভিত্তিতে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতি এবং দুর্নীতি শিক্ষকের ক্ষোভ ও বঞ্চনাবোধের অন্যতম কারণ। কিন্তু আন্দোলনের মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিকার খোঁজা পরিস্থিতি আরও অবনতি করেছে।
শিক্ষার অবকাঠামোগত দুর্বলতা
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা সংকটাপন্ন:
-
পাঠ্যপুস্তক বিতরণ প্রায় দেরিতে, জানুয়ারির অর্ধেক পেরিয়ে যাওয়ার পরও ৩ কোটি বই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছায়নি।
-
শিক্ষার মান বিশ্বমানের থেকে অনেক দূরে, মেধাবী শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন।
-
শিক্ষার্থীদের সুযোগ সংকুচিত, অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশিদের জন্য সীমাবদ্ধ করেছে।
বৈশ্বিক তুলনা
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর শিক্ষানীতি দেখায় যে, বিপ্লব ও সংস্কারের পর শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া জাতিই দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়েছে:
-
যুক্তরাষ্ট্র: আব্রাহাম লিংকন শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রবর্তন।
-
রাশিয়া: লেনিন শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব।
-
ভারত: জওহরলাল নেহরু শিক্ষায় সংস্কার।
-
চীন: মাও সে তুং শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ, বিশ্বমানের শিক্ষার্থীরা তৈরি।
বাংলাদেশে ৫৪ বছর স্বাধীনতার পরও শিক্ষার মান উন্নত হয়নি। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে না আসার কারণে দেশের মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।
প্রস্তাবনা
শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন:
-
রাজনৈতিক উদ্যোগ: শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে স্থান দিতে হবে।
-
জাতীয় ঐকমত্য: শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষের সমন্বয় জরুরি।
-
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনঃসংগঠন: শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ।
-
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, আধুনিক শিক্ষাকৌশল ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা।
-
অভিনব কৌশল: সড়ক অবরোধের পরিবর্তে আইনি ও নীতিগত উপায়ে দাবি আদায়।
উপসংহার: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে আইসিইউ-তে। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে না আসলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দুর্বিসহ হবে। আগামী নির্বাচনে যে দলই সরকার গঠন করুক, শিক্ষার উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের রাজপথ থেকে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে জরুরি।
ইব্রাহিম খলিল বাদল
সাংঘঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


