সুফি সাগর সামস্

লোকজ আধ্যাত্মিক দর্শনে একটি গভীর অর্থবহ বাক্য রয়েছে— “মরিলে মুর্শিদ মাল বাড়িবে দ্বিগুণ।” মুর্শিদ অর্থ পথপ্রদর্শক। এই বাক্যটি কেবল আধ্যাত্মিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; মানব ইতিহাস, রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর বিস্ময়কর প্রতিফলন আমরা বারবার লক্ষ্য করেছি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— পথপ্রদর্শকের শারীরিক প্রস্থান তাঁর শক্তির অবসান নয়; বরং আদর্শ, দর্শন ও প্রভাব মৃত্যুর পর আরও বিস্তৃত ও গভীর হয়ে ওঠে।
নবী মুহাম্মদ (স) জীবনের পরও বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী
মহান আল্লাহর প্রেরিত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও দর্শন তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁর জীবদ্দশার তুলনায় আজ ইসলাম একটি বৈশ্বিক সভ্যতা, নৈতিকতা ও রাষ্ট্রচিন্তার শক্তিশালী ভিত্তি। ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান প্রণেতা হিসেবে তিনি যে “মদিনা সনদ” রচনা করেছিলেন, তা মানবসমতা, নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় সহনশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক অনন্য দলিল। নবী মুহম্মদ (স) পৃথিবীর প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন।
মদিনা সনদে ধনী-গরিব, আমির-ফকির, দাস-দাসী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সমমর্যাদার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষকে একত্র করে তিনি একটি সম্মিলিত জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেন। আজকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সংবিধানের মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে মদিনা সনদের গভীর সাদৃশ্য অনস্বীকার্য। এ ক্ষেত্রে বলা যায়, পৃথিবীর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ নবী মুহম্মদ (স) এর শাসনতন্ত্র অনুকরণে পরিচালিত হচ্ছে।
ইতিহাসের পথপ্রদর্শকরা কেন মৃত্যুর পর আরও শক্তিশালী?
চীনের মাও সে-তুং, রাশিয়ার ভ্লাদিমির লেনিন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন কিংবা বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান— প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই আমরা দেখি, শারীরিক মৃত্যুর পর তাঁদের আদর্শ আরও গভীরভাবে জনগণের মননে প্রোথিত হয়েছে। কারণ ব্যক্তি মারা যায়, কিন্তু আদর্শ নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আদর্শ ব্যক্তি-সীমা অতিক্রম করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
শহীদ রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান: আদর্শের অমরত্ব
বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জীবিত অবস্থায় তাঁকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, দেশপ্রেম এবং সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসাকে হত্যা করা যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দর্শন আরও দৃঢ়, আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। একজন জীবন্ত মানুষকে নিঃশেষ করা যায়; কিন্তু একটি আদর্শকে নয়।
বেগম খালেদা জিয়া: প্রস্থান নয়, রূপান্তর
সদ্য প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবনও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। তাঁর আপসহীন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম— এসব গুণ তাঁর ইন্তেকালের পরও মানুষের হৃদয়কোটরে আরও শক্তভাবে জায়গা করে নেবে। ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, জনগণের জন্য লড়াই করা নেতৃত্ব মৃত্যুর পর স্মৃতিতে নয়, আদর্শে বেঁচে থাকে।
“মরিলে মুর্শিদ মাল বাড়িবে দ্বিগুণ”— এই বাণী কাব্যিক সত্য নয়, এটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। যে পথপ্রদর্শক মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেন, তাঁর মৃত্যু আদর্শের সমাপ্তি নয়; বরং নতুন যাত্রার সূচনা। তাই ব্যক্তির মৃত্যুতে শোক থাকলেও, আদর্শের উত্তরাধিকার আমাদের এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা হয়ে থাকে। ইতিহাসের গতিপথে এটাই চিরন্তন নিয়ম।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


