অনলাইন ডেস্ক

অক্সফোর্ড ইকোনমিকস–এর নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে Bangladesh Nationalist Party (বিএনপি) সরকার গঠন করায় দেশে রাজনৈতিক স্বস্তি ফিরেছে। তবে গত আগস্টের পর থেকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি বেড়েছে এবং কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো কাটেনি।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘রাজনৈতিক স্বস্তি ফিরলেও রূপান্তরের ঝুঁকি এখনো আছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক ০.৪ পয়েন্ট বেড়ে ৭.১–এ দাঁড়িয়েছে। এশিয়া–প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় ঝুঁকি স্কোর যেখানে ৫.১, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক ঝুঁকি সূচকে ১৬৪টি অর্থনীতির মধ্যে দেশের অবস্থান এখন ১৪১তম। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমালেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরতে সময় লাগবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পাঁচ সূচকে ঝুঁকি মূল্যায়ন
অক্সফোর্ড ইকোনমিকস পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে ঝুঁকি পরিমাপ করে—বাজার চাহিদা, বাজার ব্যয়, বিনিময় হার, রাষ্ট্রের ঋণমান এবং বাণিজ্যঋণ। ১ থেকে ১০ স্কেলে ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়; ১০ মানে সর্বোচ্চ ঝুঁকি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বাণিজ্যঋণ–সংক্রান্ত ঝুঁকি; এ ক্ষেত্রে স্কোর সর্বোচ্চ ১০। বিপুল খেলাপি ঋণ, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে; দুর্বল তদারকি এবং সীমিত ঋণতথ্য পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ব্যাংকগুলো বড় ঋণগ্রহীতা ও সেবা খাতে বেশি ঋণ দিলেও তুলনামূলক কম ঝুঁকির গৃহস্থালি ও আবাসন খাত কম ঋণ পায়।
উচ্চ সুদের হার ও খেলাপি ঋণের চাপে বাজার ব্যয় সূচকে স্কোর ৮। বাজার চাহিদায় স্কোর ৭, যা আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে বেশি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিয়মকানুন–সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ, উন্নয়ন প্রকল্পে অনিশ্চয়তা এবং প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা—সব মিলিয়ে চাহিদায় চাপ তৈরি হয়েছে।
মুদ্রা ও রিজার্ভ: আংশিক স্বস্তি
বিনিময় হার সূচকে ঝুঁকি মাঝারি—স্কোর ৫। ভাসমান বিনিময় হার চালু থাকলেও Bangladesh Bank বাজারে হস্তক্ষেপ করছে। গত বছরের বড় অবমূল্যায়নের পর টাকা কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। রিজার্ভে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেলেও তা এখনো মহামারিপূর্ব অবস্থার নিচে।
International Monetary Fund–এর কর্মসূচির আওতায় সংস্কার অব্যাহত থাকলে মধ্যমেয়াদে স্থিতিশীলতা বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কঠোর মুদ্রানীতি ও আইএমএফ সহায়তায় রিজার্ভ গত বছরের মাঝামাঝি ২২ বিলিয়ন ডলারে ওঠে, যা ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার। তবু বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে মাত্র চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
ঋণমান ও কাঠামোগত ঝুঁকি
রাষ্ট্রের ঋণমান এখনো উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কম মাথাপিছু আয়, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ এ সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও সরকারি ঋণমানকে প্রভাবিত করতে পারে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমলেও কাঠামোগত দুর্বলতা ও সংস্কার–সংক্রান্ত ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রবৃদ্ধি কমার আশঙ্কা
ব্যবসা–বাণিজ্যের শ্লথগতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪.৫ শতাংশ করেছে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস। তবে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা ৫.৭ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি সাময়িকভাবে কমলেও জানুয়ারিতে আবার বেড়ে বার্ষিক ৮.৬ শতাংশে উঠেছে, যা অক্টোবরে ছিল ৮.২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। তবে মজুরি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮ শতাংশ হওয়ায় প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং ভোক্তা চাহিদা সীমিত রয়েছে।
রপ্তানিতে নতুন চাপ
রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প নতুন চাপের মুখে। গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ঘুরে দাঁড়ালেও চতুর্থ প্রান্তিকে রপ্তানি কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আগাম ক্রয়াদেশ হ্রাস এবং জার্মানিসহ ইউরোপে চাহিদা কমে যাওয়াই প্রধান কারণ। দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় এক–পঞ্চমাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি। সেবা রপ্তানি কমায় সামগ্রিক প্রভাব আরও বেড়েছে।
সামনে চ্যালেঞ্জ
সরকারি ব্যয় সংকোচন ও ঋণের উচ্চ খরচে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৮.৬ শতাংশ থাকায় দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনা কম।
প্রতিবেদনটির সারকথা হলো—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কিছুটা স্বস্তি দিলেও অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ ছাড়া টেকসই রূপান্তর সম্ভব নয়।


