বিশেষ প্রতিবেদক

রমজান ঘিরে রাজধানীর ফলের বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। রোজা শুরুর এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফলের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে ইফতারের টেবিলে ফল রাখা এখন অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর মিরপুর, পল্টন ও শেওড়াপাড়া এলাকার খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, ইফতারের চাহিদা বাড়ায় মাল্টা, কমলা, আপেল, আঙুর ও নাশপাতির দাম এক ধাক্কায় বেড়েছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে মাল্টা ও কমলা কেজিতে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাল আপেল ৩৫০–৪০০ টাকা এবং সবুজ আপেল ৪০০–৪২০ টাকায় উঠেছে। সবুজ আঙুর ৪০০–৪২০ টাকা এবং লাল আঙুর ৫২০–৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নাশপাতি ৪৫০ টাকা এবং ডালিম ৫০০–৬০০ টাকার মধ্যে রয়েছে।
সুপারশপগুলোতে দাম আরও বেশি। সেখানে চাইনিজ কমলা ৪৪৫ টাকা, কিনো কমলা ৪০০ টাকা, সবুজ আঙুর ৫০০ টাকা এবং অস্ট্রেলিয়ান লাল আঙুর ৬৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাল আপেল ৪৪০ টাকা, সবুজ আপেল ৪৭৫ টাকা, মাল্টা ৩২৫ টাকা এবং নাশপাতি ৪১০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো সুপারশপে ডালিমের কেজি ৭৩০ টাকাও ছাড়িয়েছে।
দেশি ফলের বাজারও স্থিতিশীল নয়। পেঁপে ১৮০–২০০ টাকা, পেয়ারা ১৩০ টাকা এবং উন্নতমানের বরই ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই তরমুজ কেজিতে ১০০–১২০ টাকা। সবরি কলার ডজন ১৬০ টাকায় উঠেছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১০০–১২০ টাকার মধ্যে। সাগর কলা ১২০ টাকা এবং বাংলা কলা ১২০–১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ইফতারের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য খেজুরের বাজারেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। মান ও উৎসভেদে খেজুরের কেজি ৬০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
কেন বাড়ছে দাম?
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, রমজানে ফলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারেই দাম বাড়ছে। মিরপুর-১১ কাঁচাবাজারের ফল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিটি চালানে কেজিতে ৬০–১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
আরেক বিক্রেতা খোরশেদুল আলম বলেন, আমদানি করা কিছু ফল বন্দরে দেরিতে ছাড় হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, বিদেশি ফলের দাম বাড়ার পেছনে আমদানি শুল্ক বড় কারণ। আমদানির পর্যায়েই ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তার প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারে পড়ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত চার অর্থবছরে তাজা ফল আমদানিতে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আপেল আমদানি কমেছে প্রায় ৩৭.৩৫ শতাংশ, কমলা (মাল্টা) ৪২.৭৭ শতাংশ, আঙুর ৩৫.১১ শতাংশ, নাশপাতি ২৪.৭০ শতাংশ এবং ডালিম প্রায় ৯৪.৩৮ শতাংশ।
ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে, আপেল, আঙুর, নাশপাতি, কমলা ও মাল্টার মতো ফল বন্দর এলাকা পার হওয়ার পরই ১০০ টাকার পণ্য ১৮০–২০০ টাকায় দাঁড়ায়। এরপর পরিবহন, সংরক্ষণ ও খুচরা পর্যায়ের খরচ যোগ হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বাড়তি দাম গুনতে হয়।
ভোক্তাদের চাপ বাড়ছে
রমজানের শুরুতেই ফলের বাজারে এমন ঊর্ধ্বগতিতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। পল্লবীর বাসিন্দা মিশকাতুল ইসলাম বলেন, “আগে যে টাকায় তিন-চার ধরনের ফল কেনা যেত, এখন সেই টাকায় এক-দুই কেজির বেশি পাওয়া যায় না। রমজানে পরিবারের জন্য ফল রাখা এখন কষ্টকর হয়ে গেছে।”
আমদানি করা ফলের দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় অনেকেই দেশি ফলের দিকে ঝুঁকছেন। তবে সেখানেও দাম বেড়ে যাওয়ায় স্বস্তি মিলছে না। ফলে রমজানের বাজারে ফল এখন আর নিয়মিত কেনাকাটার স্বাভাবিক অংশ নয়; বরং বেশির ভাগ ভোক্তাকে আলাদা করে হিসাব কষতে হচ্ছে—কোন ফল নেওয়া যাবে, আর কোনটি বাদ দিতে হবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং আমদানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ না নিলে রমজানের বাকি সময়জুড়ে ফলের বাজারে স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা কম।


