সুফি সাগর সামস্

বর্ষপরিক্রমায় আবারও আমাদের দ্বারে মার্চ মাস উপস্থিত হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে মার্চ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। এই মাসের আগমনে মনে পড়ে অগ্নিঝরা স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা, যে আন্দোলন আমাদের জাতিকে তার মর্যাদা এবং অধিকার সুরক্ষার জন্য রক্তের বিনিময় করতে শিখিয়েছে। কোনো জাতিই স্বাধীনতা ছাড়া মর্যাদাবানভাবে বাঁচতে পারে না।
স্বাধীনতা চাওয়া সহজ, কিন্তু তা অর্জন করা কখনো সহজ নয়। দীর্ঘ ইতিহাসে বাংলাদেশের মানুষ বহুবার পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে বাধ্য হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা এতটাই ছিল যে, ব্রিটিশরা সতর্ক ছিল—যদি এই মানুষ একজোট থাকে, তারা বিপদে পড়বে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পেছনে এই ভীতিই অন্যতম কারণ ছিল।
স্বাধীনতার পথে বাংলাদেশ কখনো একরূপ হয়নি। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের গঠন, আমাদের জনগণকে প্রতারিত করেছিল। তারা ধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, কিন্তু ভাষা ও স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে জাতীয়তাবাদী চেতনা উজ্জীবিত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের দেখিয়েছিল—মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বুকের রক্ত দিতেও পিছপা হয়নি জনগণ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত অধ্যায়। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ মানুষকে হত্যা করে, নেতৃবৃন্দ গ্রেপ্তার হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক থেকে সাধারণ মানুষ—সবার মধ্যে তখন স্বাধীনতার অগ্নি জ্বলে ওঠে। ফেনী, কলকাতা, ঢাকা—দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য মানুষ লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা পাই, যা কেবল রক্তের বিনিময়ে সম্ভব হয়েছিল।
স্বাধীনতার পরেও আমরা দেখেছি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। একদলীয় শাসন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি—এই চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। তবে বর্তমান সময়ে নতুন সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যা জাতির জন্য সুবর্ণ সুযোগ। এখনই সময়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অর্জনকে মজবুত করা, বৈষম্য দূরীকরণ করে একটি আধুনিক, সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত রাষ্ট্র গড়ে তোলা।
মার্চ মাস তাই শুধুই ইতিহাস নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা অর্জন সহজ নয়, কিন্তু তা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। এই মাস আমাদের শেখায়, লড়াই, ত্যাগ এবং ঐক্যের মাধ্যমে আমরা জাতিকে মর্যাদা ও স্বাধীনতা দিতে পারি।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


