বিশেষ প্রতিবেদক

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর ঘোষিত পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে রায়ের পরপরই নতুন নির্বাহী আদেশে প্রায় সব দেশের ওপর ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করায় অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য যেমন ঝুঁকি তৈরি করছে, তেমনি নতুন করে দর-কষাকষির সুযোগও তৈরি করছে—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার হওয়ায়।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: আদালতের রায় ও নতুন নির্বাহী আদেশ
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে আগের পাল্টা শুল্ক কার্যত বাতিল হলেও নতুন নির্বাহী আদেশে সমান হারে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বিশ্ববাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষক মাশরুর রিয়াজের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ সরে আসা বাংলাদেশের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। বরং যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে কৌশলগতভাবে পুনরায় আলোচনায় যাওয়াই হবে কার্যকর পথ।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান: ঝুঁকি ও সম্ভাবনা
শুল্ক কাঠামোর জটিলতা
পূর্ববর্তী সমঝোতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের ওপর মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছিল ৩৪.১ শতাংশ। তবে মার্কিন তুলা ব্যবহার করে তৈরি পণ্য রপ্তানিতে শূন্য শুল্কের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, আদালতের রায়ের ফলে সব দেশের জন্য শুল্ক কাঠামো আপাতত সমান অবস্থায় এসেছে। তবে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভবিষ্যৎ এখনো অস্পষ্ট।
পোশাক খাতের হিসাব-নিকাশ
বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক। নিট পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক মনে করেন, এই রায়ের ফলে বিদ্যমান চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, সমান হারে শুল্ক আরোপের ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবধান কিছুটা কমেছে। তবে মার্কিন আমদানিকারকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, যার ফলে নতুন অর্ডার ও মূল্য নির্ধারণে সতর্কতা দেখা যাচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে এই অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির দিকে ঝুঁকতে পারেন ক্রেতারা—যা উৎপাদন পরিকল্পনায় চাপ তৈরি করতে পারে।
১৩৩ বিলিয়ন ডলার: ফেরত মিলবে কি?
ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইতোমধ্যে ১৩৩ বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর অনেক কোম্পানি শুল্কের অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তাদের ওপর চাপিয়েছে। শুল্ক ফেরতের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় রয়েছেন—রায়ের বাস্তব প্রভাব কী দাঁড়ায় তা দেখার জন্য।
কী করবে বাংলাদেশ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি কৌশলগত পথ রয়েছে—
-
দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পুনর্বিবেচনা: বিদ্যমান চুক্তির যেসব ধারা বাংলাদেশের জন্য অসুবিধাজনক, সেগুলো নিয়ে পুনরায় আলোচনায় যাওয়া।
-
বাণিজ্য ভারসাম্য সমন্বয়: যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান, কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য আমদানি বাড়িয়ে ঘাটতি কমানোর কৌশল অব্যাহত রাখা।
-
বাজার বৈচিত্র্যকরণ: ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণ করে ঝুঁকি কমানো।
বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেয়েছে। নতুন সরকারের উচিত হবে বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করে স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ শর্ত নিশ্চিত করা।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। যদিও নতুন নির্বাহী আদেশ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে, তবুও বাংলাদেশের জন্য এটি কৌশলগত আলোচনার একটি সুযোগ।
অনিশ্চয়তার ভেতরেই সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে—এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে।





