বিশেষ প্রতিবেদন

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক ধাক্কার আশঙ্কা আপাতত কম বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে সরকারের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় অর্থ বিভাগ এ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। ইতোমধ্যে প্রতিবেদনটি অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা Amir Khasru Mahmud Chowdhury-এর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকারের পরবর্তী মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিষয়টি উপস্থাপন করে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণ করা হতে পারে।
স্বল্পমেয়াদে বড় সংকটের আশঙ্কা কম
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ শুরু হয়েছে মাত্র প্রায় ১২ দিন আগে। এত অল্প সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন। তবে বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকায় স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের জ্বালানিসংকটের সম্ভাবনা কম।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের কোনো চাহিদা আসেনি। বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ থেকেই বর্তমানে জ্বালানি ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা মেটানো হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে এবং বরাদ্দ শেষ হয়ে গেলে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি আরও জানান, গত কয়েক দিনে এলএনজি ও জ্বালানি তেলবাহী বেশ কয়েকটি জাহাজ বাংলাদেশের জলসীমায় পৌঁছেছে এবং আরও কিছু জাহাজ আসার পথে রয়েছে। চাহিদা মেটাতে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি ক্রয় করা হচ্ছে এবং বিকল্প উৎস থেকেও সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
কৃষি খাতে আপাতত স্বস্তি
অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটলে অন্যান্য খাতেও তাত্ক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা কম। কৃষি মৌসুম সামনে রেখে দেশের গুদামগুলোতে ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে, যা কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সহায়ক হবে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বাড়তে পারে ঝুঁকি
তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নৌপথ Strait of Hormuz দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ দ্রুত বাড়তে পারে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২৫ শতাংশ পরিবহন করা হয়।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে Iran এ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এই পথ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়বে এবং এর প্রভাব সরাসরি পড়বে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির ওপর।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি
সরকারি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কয়েকটি সম্ভাব্য ঝুঁকির দিক তুলে ধরা হয়েছে—
-
আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম বৃদ্ধি
-
জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ায় ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি
-
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আমদানি পণ্যের দাম বাড়া
-
বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি
কেন এখনই বড় সংকট দেখছে না সরকার
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, কয়েকটি কারণে তাৎক্ষণিক বড় সংকটের আশঙ্কা তুলনামূলক কম—
-
প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে
-
এলএনজি ও জ্বালানি তেলের কয়েকটি চালান ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে
-
আরও জ্বালানি জাহাজ পথে রয়েছে
-
কৃষি খাতের জন্য পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে
-
সরকার বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে
তবে কর্মকর্তারা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, তাহলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়, ভর্তুকি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। এজন্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার।


