ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের রাজনীতি ভেঙে গিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে এক নতুন নির্বাচনি বাস্তবতায়। একসময় একই মঞ্চে আন্দোলন করা রাজনৈতিক দলগুলোই এবার জাতীয় নির্বাচনে একে অপরের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে নামছে। বিএনপির দীর্ঘদিনের শরিক এলডিপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি জোটে যোগ দেওয়ায় রাজনীতির পুরোনো সমীকরণ কার্যত ভেঙে পড়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ সরাসরি বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। একইভাবে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নাহিদ ইসলামের দল এনসিপিও জামায়াত জোটের ব্যানারে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন জোটের ঘোষণা দেন। যদিও সেখানে এনসিপির কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না, পরে রাতে নাহিদ ইসলাম নিজেই সংবাদ সম্মেলন করে জোটে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
জামায়াত জোটে বিস্তার, এনসিপিতে ভাঙন
জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাগপা ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টিসহ আটটি দল আসন সমঝোতার ভিত্তিতে সব আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। নতুন করে এলডিপি ও এনসিপি যুক্ত হওয়ায় জোটের শরিক দলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০টিতে।
তবে জামায়াত জোটে যোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এনসিপিতে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, মনিরা শারমিনসহ একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। আরও অন্তত ৩০ জন নেতা নাহিদ ইসলামের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। দলের ভেতরে বড় অংশের এই অসন্তোষ এনসিপির সাংগঠনিক ঐক্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বিএনপিতে উৎসব, ‘ধানের শীষ’ ঘিরে ঐক্য
অন্যদিকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিতে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। দীর্ঘদিন পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সশরীরে দেশে ফেরা তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করেছে। ঢাকায় তাঁর সংবর্ধনা সমাবেশে জনসমাগম সেই উত্তেজনারই প্রতিফলন।
নির্বাচনি প্রস্তুতিতে বিএনপি এখন পুরোপুরি মনোযোগী। যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের জন্য ইতোমধ্যে ১৫টি আসনে সমঝোতা করেছে দলটি। তবে নিবন্ধন আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত দলগুলো নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করলেও অনিবন্ধিত দলগুলোর অনেক নেতা নিজ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন। আবার নিবন্ধিত দলের শীর্ষ নেতারাও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিবেচনায় দলীয় পদ ছেড়ে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন।
বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা থাকা সত্ত্বেও নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করবে। ইতোমধ্যে গণতন্ত্র মঞ্চের তিন শীর্ষ নেতা—মাহমুদুর রহমান মান্না, সাইফুল হক ও জোনায়েদ সাকিকে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
প্রতীকই এখন বড় বাস্তবতা
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এককভাবে নির্বাচনি মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে না পারার বাস্তবতা থেকেই অনেক শরিক নেতা ধানের শীষকে নিরাপদ প্রতীক হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের দুর্বলতা ও ভোটের সমীকরণও এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও এই বাস্তবতা মেনে শরিকদের ধানের শীষে নির্বাচন করতে উৎসাহিত করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নিজস্ব প্রতীকে জয়ের অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক শরিক নেতা ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তারেক রহমান ফ্যাক্টর
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য নির্বাচনি মাঠে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন নেতৃত্বের শূন্যতায় থাকা তৃণমূল এখন সরাসরি নেতৃত্ব পাচ্ছে। বগুড়া ও সিলেট সফর, মাজার জিয়ারত এবং দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে তাঁর যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিএনপিকে মানসিক ও সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর আন্দোলনকেন্দ্রিক নয়, এটি পুরোপুরি নির্বাচনিকেন্দ্রিক। পুরোনো জোট ভেঙে নতুন জোট গড়ে উঠছে, সাবেক মিত্ররা মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে, আর আদর্শের চেয়ে প্রতীক ও আসন হয়ে উঠছে প্রধান বিবেচ্য। এই নির্বাচনে ফলাফল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—এই নতুন জোটরাজনীতি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে কোন পথে নিয়ে যাবে।


