অনলাইন ডেস্ক

গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর বার্ষিক সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে দেশের অর্থনীতি, গণতন্ত্র, রাজনীতি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সিপিডি চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান। বক্তারা ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক কাঠামোর সম্পর্ক, নির্বাচনী আচরণ, বুদ্ধিজীবী সমাজের নিষ্ক্রিয়তা এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যর্থতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ব্যবসা-রাজনীতি: প্যাট্রন–ক্লায়েন্ট সম্পর্কের উদ্বেগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর মন্তব্য করেন,
বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এখন “প্যাট্রন–ক্লায়েন্ট” সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ।
তিনি ব্যাখ্যা করেন—
-
ব্যবসায়ীদের টিকে থাকতে হলে ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
-
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর ব্যবসার নির্ভরশীলতা বাজার প্রতিযোগিতা, ন্যায্যতা ও সুশাসনকে দুর্বল করছে।
-
একটি সুস্থ বাজার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা জরুরি।
নির্বাচনী সংস্কৃতি ও প্রতীকভিত্তিক ভোটের সমালোচনা
গভর্নর মনসুর দেশের ভোটার আচরণ ও দলীয় প্রতীককেন্দ্রিক নির্বাচনী সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন—
-
প্রতীক দেখে ভোট দেওয়া গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে বরং স্বৈরাচারী নেতৃত্বের পথ উন্মুক্ত করে।
-
ভোটাররা প্রার্থী, তার যোগ্যতা বা জবাবদিহিতা বিচার না করে কেবল প্রতীককে ভিত্তি বানানোয় রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
-
ফলস্বরূপ গণতন্ত্রের স্পিরিট ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কারও বাধাগ্রস্ত হয়।
বুদ্ধিজীবী সমাজের নীরবতা ও গণতান্ত্রিক স্থবিরতা
গত ১৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, চিন্তাশীল মহল, গবেষণা গ্রুপ ও ইন্টেলেকচুয়ালদের কোনো কার্যকর জনদাবি, বিতর্ক বা গণমুখী আলোড়ন দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন গভর্নর মনসুর।
তিনি মনে করেন—
-
বুদ্ধিজীবী সমাজের নিষ্ক্রিয়তা গণতান্ত্রিক চর্চার দুর্বলতার একটি প্রধান সূচক।
-
সমাজে নীতি–সংলাপ কমে গেলে রাজনীতির ওপর জনগণের নজরদারি নষ্ট হয়।
-
রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহিতাও কমে আসে।
ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যর্থতা ও দীর্ঘমেয়াদি শাসন
গভর্নর বলেন—
-
১৯৯০ পরবর্তী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর শান্তিপূর্ণভাবে হয়নি।
-
প্রতীককেন্দ্রিক ভোট ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিকৃতি ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্ব তৈরি করেছে।
-
ক্ষমতা ধরে রাখতে অবৈধ উপায়—প্রশাসনিক প্রভাব, রাজনৈতিক দমন, নির্বাচনী অনিয়ম—ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।
-
এ পরিস্থিতি গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।
সিপিডি চেয়ারম্যান রেহমান সোবহানের পর্যবেক্ষণ
সম্মেলনে রেহমান সোবহান দেশীয় রাজনীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নীতিনির্ধারণ ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে মত দেন। তিনি উল্লেখ করেন—
-
উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা অপরিহার্য।
-
রাষ্ট্রীয় ও বাজার কাঠামোতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভেঙে সমতাভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
-
নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও শক্তিশালী সিভিল সোসাইটির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
বিআইডিএস-এর সম্মেলনে দুই শীর্ষ অর্থনীতিবিদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে—
-
ব্যবসা-রাজনীতি সম্পর্কের বিকৃতি,
-
প্রতীকভিত্তিক ভোটের দুর্বল সংস্কৃতি,
-
বুদ্ধিজীবীদের নীরবতা,
-
এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে ব্যর্থতা
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কাঠামো একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
টেকসই উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন—
-
নির্বাচনী আচরণের পরিবর্তন,
-
বুদ্ধিজীবী সমাজের সক্রিয় ভূমিকা,
-
এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ।


