মোঃ খুরশীদ আলম সরকার

দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি আয়ের খাত তৈরি পোশাকশিল্প এখন স্পষ্ট মন্দার মুখে। টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি কমার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসহ অন্তত ২৬টি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে একযোগে পতন এই খাতের সামনে গভীর সংকেত দিচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, এটি কেবল সাময়িক ওঠানামা নয়; বরং বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির সরাসরি প্রতিফলন।
ইউরোপে বড় ধাক্কা, ছোট বাজারে ভয়াবহ পতন
ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানির পতন সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ক্রোয়েশিয়ায় এক বছরে রপ্তানি কমেছে ৭৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ—৩৪ মিলিয়ন ডলার থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৮ মিলিয়নে। রোমানিয়ায় কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ, স্লোভেকিয়ায় ২২ শতাংশের বেশি, লুক্সেমবার্গে ২৬ শতাংশ। এসব তুলনামূলক ছোট বাজারে এমন বড় পতন ইঙ্গিত দেয়—বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি এখন প্রান্তিক বাজারে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে।
ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোও ব্যতিক্রম নয়। জার্মানিতে রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ, ইতালিতে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, ফ্রান্সে প্রায় ১১ শতাংশ এবং ডেনমার্কে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ইউরোপজুড়ে মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা ব্যয় সংকোচন ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পোশাকের মতো নন-এসেনশিয়াল পণ্যের চাহিদাকে স্পষ্টভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে স্থবিরতা, নতুন অ্যালার্ম
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমেছে সামান্য—শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ। সংখ্যায় এটি ছোট মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি বড় সতর্ক সংকেত। কারণ, কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করেই সামগ্রিক রপ্তানি প্রবাহ টিকে ছিল। এখন সেখানে প্রবৃদ্ধি থেমে যাওয়ার অর্থ—বাংলাদেশের রপ্তানি ইঞ্জিন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে।
অপ্রচলিত বাজারেও ছায়া
যে অপ্রচলিত বাজারগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভরসা হিসেবে ধরা হচ্ছিল, সেখানেও মন্দার ছাপ। রাশিয়ায় রপ্তানি কমেছে ২৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ, তুরস্কে ২৫ দশমিক ৮০ শতাংশ, মেক্সিকোতে ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এমনকি এশিয়ার বড় বাজার ভারত (-১০.৪৪%), দক্ষিণ কোরিয়া (-১২.৮৪%) ও অস্ট্রেলিয়া (-১২.৪৪%)—সবখানেই নিম্নমুখী প্রবণতা।
কেন এই মন্দা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করছে—
-
বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা: ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বিভাজন সরবরাহ চেইন ও ভোক্তা আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
-
অর্থনৈতিক চাপ: ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ সুদহার ও মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তারা পোশাকের মতো পণ্যে ব্যয় কমাচ্ছেন।
-
অর্ডার রি-শাফলিং: ক্রেতারা কম দামে, কম ঝুঁকির উৎস খুঁজছেন; ভিয়েতনাম, ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বেড়েছে।
-
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: জ্বালানি, কাঁচামাল ও লজিস্টিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ কঠিন হচ্ছে।
পুনরুদ্ধারের পথ কোথায়?
বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, এই মন্দা পুরোপুরি স্থায়ী নয়। তাঁর ভাষায়, “বিশ্ববাজারে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাময়িকভাবে রপ্তানি মন্দা দেখা দিয়েছে। তবে উদ্ভাবনী উদ্যোগ, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং নতুন বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে।”
বিশেষজ্ঞরা যে দিকগুলোতে দ্রুত পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন—
-
উচ্চ মূল্য সংযোজন: বেসিক পোশাকের বাইরে ডিজাইন ও ফাংশনাল অ্যাপারেলে বিনিয়োগ।
-
ডিজিটাল মার্কেটিং ও সরাসরি ব্র্যান্ডিং: মধ্যস্বত্বভোগী কমিয়ে ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ।
-
বাজার বৈচিত্র্য: লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত প্রবেশ।
-
সরবরাহ চেইন দক্ষতা: সময় ও ব্যয় কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন।
টানা পাঁচ মাসের রপ্তানি পতন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। বৈশ্বিক মন্দা যেখানে বাস্তবতা, সেখানে পুরোনো মডেলে টিকে থাকা কঠিন। দ্রুত নীতি সহায়তা, শিল্পের ভেতরে কাঠামোগত সংস্কার এবং বাজারমুখী কৌশল গ্রহণ করতে না পারলে এই সাময়িক মন্দা দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নিতে পারে। তবে সঠিক সিদ্ধান্ত ও সময়োপযোগী উদ্যোগই পারে আবারও এই খাতকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে ফিরিয়ে আনতে।
মোঃ খুরশীদ আলম সরকার
দপ্তর সম্পাদক
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


